বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন
এই লেখাটি বেরুবে দোসরা জানুয়ারি, ২০২৬। যদিও এই মুহূর্তে লেখার অনেকগুলো বিষয় ছিল কিন্তু ভেবে দেখলাম সব দোসরা জানুয়ারি শুক্রবার নয়। তাই আজকের বিজন ভাবনায় নিজের কথা কিছু বলি। অবশ্য দোসরা জানুয়ারি এক সময় একটি সাধারণ দিন ছিল যা না চাইলেও মনে রাখতে হত, ব্যবহার করতে হত। আর তার কারণ আমাদের সময়ে মানুষের জন্মদিন হত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্জি অনুযায়ী। সে সময় আমাদের দেশের খুব কম মানুষই নিজেদের জন্মদিন জানত বা পালন করত। সাধারণত বলত অমুক বন্যার বা ঝড়ের বা দুর্যোগের বছর অমুক মাসে জন্ম। শহরে অথবা শিক্ষিত পরিবারে চল থাকলেও সাধারণ মানুষ জন্মদিনের হিসেব বলতে গেলে রাখতই না। তাই আমাদের সময়ের লোকদের দেখা যায় আসল জন্মদিন একটি আবার সার্টিফিকেটে আরেকটি। বিশেষ করে স্কুলে শিক্ষকগণ এটা করতেন যাতে দীর্ঘ সময় চাকরির বয়স থাকে সেটা হিসেব করে। কারণ আগে তো বটেই, এখনও আমাদের দেশে লেখাপড়া করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সরকারি চাকরি পাওয়া। তবে সময়ের সাথে সাথে সব কিছু বদলে গেছে, প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি এখন অনেক বেশি লোভনীয়। তাছাড়া ঘরে ঘরে এসেছে জন্ম নিবন্ধন। ফলে এখন আর জন্ম তারিখ নিয়ে আগের মত আর অংক কষতে হয় না।
আমার জন্ম ৯ই পৌষ ১৯৭০ বা ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩। তারিখটা আমি জানতাম। যেহেতু বাড়িতে কুষ্ঠী রাখা হত, তাই শুধু বছর, মাস, তারিখ, দিন নয় এমনকি ঘন্টা মিনিট পর্যন্ত জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ধারণা করা হত এর উপর ভিত্তি করে জ্যোতিষী সেই সময়ে আকাশে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতেন আর গ্রহদের (হিন্দু বিশ্বাস মতে যারা দেবতা তুল্য) অবস্থানের উপর নির্ভর করত নবজাতকের ভাগ্য। এছাড়া বাড়িতে জন্মদিন পালনের প্রথা ছিল। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে সার্টিফিকেট নেবার সময় যখন ছোট মাস্টারমশাইকে বললাম আমার জন্ম ১৯৬৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি কেন যেন ১৯৬৪ সালের ০২ জানুয়ারি লিখে দিলেন। ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন, তাই ওটা নিয়ে আমার অন্য রকম আগ্রহ ছিল। ছোট মাস্টারমশাইকে আবারও বললে তিনি বলেন, ব্যবধান তো মাত্র ৭ দিনের, কিন্তু ১৯৬৪ হলে চাকরির ক্ষেত্রে এক বছর সুবিধা পাব। তাছাড়া এক জনের জন্মদিন যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তখন জানা ছিল না। এমনকি অনেক দিন পর্যন্ত খুব অল্প জায়গায়ই জন্ম তারিখ লিখতে হত, ফলে তেমন অসুবিধা অনুভব করিনি আর নিজের জন্মদিন সব সময়ই ২৫ ডিসেম্বর পালন করে এসেছি। সেই অর্থে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ০২ জানুয়ারি আমার জন্য ছিল উড়ে এসে জুড়ে বসা এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেটা পালটে যায় ২০০৩ সালের ০২ জানুয়ারি সেভার জন্মের পর। ওর জন্মের বেশ কিছুদিন পরে যখন রেজিস্ট্রি অফিসে গেছি ওর বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য, ফর্ম দেখে ভদ্রমহিলা বললেন,
- বাহ, আপনার আর আপনার ছেলের জন্ম দেখছি একই দিন, ০২ জানুয়ারি।
আসলে এর আগে একথা মনেই হয়নি। আর এভাবেই ০২ জানুয়ারি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়, যাকে আর বাধ্য হয়ে নয়, ভালবেসে মনে রাখি।
এভাবেই অনেক দিন বছর পেরিয়ে যায়। সেভা বড় হতে থাকে চোখের সামনে। মনিকা আর ক্রিস্টিনার ধারণা সেভা ওদের চেয়ে বেশি আদরের। তাই সুযোগ পেলেই আমাকে খোঁটা দেয় সেভার প্রতি পক্ষপাতিত্বের জন্য। মনিকাই একদিন বলল, সেভার জন্মদিনেই যত সমস্যা – ওর জন্ম ২০০৩ সালের ০২ জানুয়ারি যা সাধারণত লেখা হয় ০২/০১/০৩ – আর এ দেশে এগুলো যথাক্রমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস আর ইমারজেন্সির নম্বর – যেখানে মানুষ ফোন করে বিপদে পড়লে। মনে পড়ে মনিকার কথা শুনে তখন লিখেছিলাম
জন্মদিন
আজ থেকে অনেক বছর আগে
এই দিনটায় জন্ম নিলো সেভা
তরতরিয়ে এমন বড় হবে
সেই দিনটায় জানতো বল কে বা?
এই মাত্র বছর খানেক আগে
ওর মাথাটা আমার কান ছুয়ে
বালক সুলভ কইত কত কথা
শুনতাম আমি ঘাড়টা একটু নুয়ে
এক বছরেই বেড়েছে হাতে পায়ে
মাথা এখন আকাশ ছুঁই ছুঁই
এই দিনটায় জন্ম নিলো সেভা
বছরের প্রথম মাস তারিখ ছিল দুই
দুই হাজার দুই সবে শেষ
শুরু হোল দুই হাজার তিন
মাস দিন বছরের হিসেবে
লিখি আমি ০১ ০২ ০৩
ফায়ার সার্ভিস পুলিশ ইমারজেন্সী
কাউকে আমার নেই আজ প্রয়োজন
আজকে আমার সেভার জন্মদিন
আজকে শুধুই আনন্দ আয়োজন।
সেটা অবশ্য ২০১৮ সালে, আজ থেকে আট বছর আগে। এখন সেভা আগের সেই ছোট ছেলেটি নেই। রুশরা বলে শিশু সন্তান - ছোট সমস্যা, বয়স্ক সন্তান – বড় সমস্যা। আমি এর সাথে যোগ করি অনেক অনেকগুলো সন্তান অনেক সমস্যা, আর যদি তাদের সাথে অনেক পোষা প্রাণী থাকে তাহলে সমস্যার শেষ নেই। যদিও এটা ঠিক যে আনন্দেরও কমতি নেই। এখন প্রশ্ন হল ছেলেমেয়েদের কোন কাজ বাবা মাকে আনন্দ দেয়। অধিকাংশ বাবা মার কাছে সেটা অবশ্যই ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট, জীবনে তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এর কারণ তাতে বাবা মা চিন্তা মুক্ত হয়, তারা না থাকলে ছেলেমেয়েরা যে বানের জলে ভেসে যাবে না সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়। গুলিয়াও সেটাই মনে করে। আমার চিন্তা একেবারেই ভিন্ন। আমি যেহেতু প্রায় সব কাজই নিজের খুশিমত করেছি বা এখনও করি আর স্মৃতিশক্তি প্রখর বিধায় ছোটবেলা দৃশ্যমান, তাই আমার ছেলেমেয়েরা নিজেরা যা চায় আমি মনে করি সেটাই তাদের করা উচিৎ। কারণ জীবন তাদের। যদি একজন মানুষ তার কাজ থেকে আনন্দ না পায় তাহলে তাতে সে যত পয়সাই পাক, জীবনে সুখী হবে না। একটা দুঃখ থেকেই যাবে যে ঠিক যা হতে চেয়েছিল সেটা হতে পারল না। তাই আমি ওরা যা চায় সেটাতেই সায় দেই আর সাধ্যমত সাহায্য করি। এর ফলাফল যে ভালো হয়েছে সেটা বলতে পারব না, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমার লাই পেয়ে প্রায় কেউই শেষ পর্যন্ত তাদের মেধার বিকাশ করতে পারেনি। যদি সেভার কথা বলি, এক সময় অংক খুব পছন্দ করত। আমার দিক থেকে সব রকমের সহায়তা ছিল। একই সাথে ভায়োলিন ও পিয়ানো বাজাত ভালো। সঙ্গীত বিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু কোন এক সময়ে এক শিক্ষকের সাথে সমস্যার ফলে ওসব বলতে গেলে বাদ দেয়। এখানে আমার দোষ মনে হয় আমি ওদের সব সময়ই দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ দেই। সব শিক্ষক সেটা ঠিক মানতে পারেন না। সে সময় ও ফুটবল খেলার দিকে ঝুঁকল। আমি পক্ষে মত দিলাম। ফুটবল আর মিউজিকের টানাপোড়ন থেকেই শিক্ষকের সাথে ঝামেলা হয়েছিল। ও সঙ্গীত বিদ্যালয়ে যাওয়া বাদ দিল। তারপর এক সময় খুব আগ্রহ দেখা দিল কসমোলজির উপর। ইউ টিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখত, আমিও নামকরা কসমোলজিস্টদের লেকচার পাঠাতাম। সেটা কাটলে ফিলোসফির প্রতি আগ্রহ জন্মাল। কান্ট, সোপেনহাউয়ার এদের পড়তে শুরু করল। কিন্তু আসল যেটা মানে একাডেমিক পড়াশুনা লাটে উঠল। এরমধ্যে অবশ্য মন্তাঝের উপর কলেজ শেষ করল। চিপ তৈরি করা এদের মূল কাজ। তবে শেষ করেই বলল এ লাইনে কাজ করবে না, যদিও যুদ্ধ শুরু হবার পর এদের বেশ চাহিদা। এরপর একদিন আমাকে মেসেজ করে দিল। আমার এমনিতে শরীর ব্যথা। আগেও দিত। তবে এখন দেখি সাথে সাথে আমাকে মানুষের এনাটমি নিয়ে বলছে। তখন জানলাম ও মেসেজের উপর একটা কোর্স শেষ করেছে। ইদানিং লেগেছে গাছপালার পেছনে। ওর ঘর এখন ছোটখাটো গ্রীন হাউজ। গোলাপ দিয়ে ভর্তি। সাথে শশা, টম্যাটো, বিভিন্ন শাঁক। এমনকি প্যাসিফ্লাউফার, লেবু, কমলালেবু এসব লাগিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে। এখন ওর জল আর বিদ্যুতের বিল দিতেই আমার হিমশিম অবস্থা। এমনকি কয়েক দিন আগে পুলিশ এসেছিল। ধারণা করছি হয়তো প্রায় সারাদিন এত আলো জ্বলতে দেখে কেউ রিপোর্ট করেছিল আর এখানে নিষিদ্ধ কিছু চাষ হয় কিনা সেটা দেখতে ওদের আগমন। এছাড়া আছে ভায়োলিন। হ্যাঁ, এখনও ভায়োলিন ওর খুব পছন্দ। ইউ টিউবে দেখে দেখে নিজেই বাজায়। বলেছিলাম পুরানো শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করে আবার শিখতে, রাজী না, বলে নিজে নিজেই শিখবে যেমন শেখে ঘরে বিভিন্ন শাঁক সব্জি ফুল ফলের চাষ। বলেছিলাম ও যেন এগ্রিকালচার নিয়ে পড়াশুনা করে, না, করবে না। বলে অযথা সময় নষ্ট। এটা নাকি ইউ টিউব থেকেই শেখা যায়। তবে চাইলেও ভর্তি হতে পারবে না। এখানে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। ওর ক্লাসমেটরা যখন দল বেঁধে সেখানে নাম লেখায়, বয়সের কারণে ও যেতে পারেনি। পরের বছর যখন যাওয়ার কথা ছিল তখন কোভিড-১৯ এর তাণ্ডব চারিদিকে। তাই আর করা হয়নি। এরপর যুদ্ধ লাগল। ফলে আমরা নিজেরা এখন আর ওখানে যেতে আগ্রহী নই। আসলে এই সমস্যা অনেক ফ্যামিলির, বিশেষ করে যখন ছেলেরা নিজেরাই সামরিক প্রশিক্ষণে আগ্রহী নয়। আর যদি আঠার বছর পূর্ণ হবার পর কারও মিলিটারি আইডেন্টিটি কার্ড (এই কার্ড প্রশিক্ষণের আগেই দেয়, এটা আসলে এক ধরণের হিসেব রাখা) না থাকলে তার পক্ষে কোথাও ভর্তি হওয়া বা অফিসিয়ালি কোন কাজে ঢোকা অসম্ভব। তাই আমরা অপেক্ষায় আছি ইউক্রেন যুদ্ধ কবে শেষ হবে। তাহলে হয়তো ঐ কার্ড পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নিজে যেহেতু শিক্ষকতা করি তাই সেভা একাডেমিক পড়াশুনা না করলেও আমি হতাশ নই। অভিজ্ঞতা বলে এখন ছেলেমেয়েরা ইনকাম ওরিয়েন্টেড তবে অনেকেই সেটা করতে চায় নিজের শর্তে। যার ফলে ফ্রি ল্যান্সার এত জনপ্রিয়। সেভা বিভিন্ন কাজ জানে। টাকার দরকার হলে বিজ্ঞাপন দিয়ে কয়েকদিন কাজ করে, আবার নিজের হবি নিয়ে পড়ে থাকে। অবশ্য আমি সবসময় সাহায্য করি আর মনে করিয়ে দেই আমি অমর নই। এ নিয়ে গুলিয়া চিন্তিত, মনিকা বলে আমার জন্যই সেভা এমন। আমার কিন্তু সেভাকে হিংসা করতে ইচ্ছা করে। অনেক কিছু পারে, সবচেয়ে বড় হাতেকলমে করতে পারে। ঘরে রিপেয়ারিং করা দরকার ঠিক করে ফেলবে। ইলেক্ট্রিসিটি ও স্যানিটারি সংক্রান্ত অনেক কাজ আমি পারি, অন্তত ফিজিক্সটা জানি। এসব বিষয়ে আমার সাহায্য নেয়। তবে ও যত একাগ্রতা নিয়ে কোন কাজ করে আমার সেটা হয় না। অন্যদিকে আমি যেমন চল্লিশ বছর ধরে ফিজিক্স নিয়েই কাজ করতে পারি, সেভা খুব বেশি দিন কোন বিষয়ে আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না। আর অনেক টাকা পয়সা করতে হবে এমনটা ভাবে না। যেটা আমি নিজেও পছন্দ করি। আমি যদি প্রচণ্ড অগোছালো হই, সেভা খুব ফিটফাট। আমার ধারণা ও যদি আর দশজনের মত হত, মানে একাডেমিক পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত তাহলে আমার অনেক কিছুই জানা হত না। কারণ ছাত্রজীবনে আমি বুঝতে পারতাম না কীভাবে ক্লাস ফাঁকি দেয়া যায় বা পড়াশুনা খারাপ করা যায়, এখন আমি বুঝি আমরা যেটাকে সঠিক পথ মনে করি সেটাই একমাত্র পথ নয়, এর বাইরেও হাজারটা পথ আছে এবং সেসব পথে চলেও জীবনে আনন্দ পাওয়া যায়। আর কেউ অন্যের ক্ষতি না করে শুধু নিজের কাজটা ঠিকঠাক করেই সমাজ তথা দেশের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০২ জানুয়ারি ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
আমার জন্ম ৯ই পৌষ ১৯৭০ বা ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩। তারিখটা আমি জানতাম। যেহেতু বাড়িতে কুষ্ঠী রাখা হত, তাই শুধু বছর, মাস, তারিখ, দিন নয় এমনকি ঘন্টা মিনিট পর্যন্ত জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ধারণা করা হত এর উপর ভিত্তি করে জ্যোতিষী সেই সময়ে আকাশে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করতেন আর গ্রহদের (হিন্দু বিশ্বাস মতে যারা দেবতা তুল্য) অবস্থানের উপর নির্ভর করত নবজাতকের ভাগ্য। এছাড়া বাড়িতে জন্মদিন পালনের প্রথা ছিল। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে সার্টিফিকেট নেবার সময় যখন ছোট মাস্টারমশাইকে বললাম আমার জন্ম ১৯৬৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি কেন যেন ১৯৬৪ সালের ০২ জানুয়ারি লিখে দিলেন। ২৫ ডিসেম্বর বড় দিন, তাই ওটা নিয়ে আমার অন্য রকম আগ্রহ ছিল। ছোট মাস্টারমশাইকে আবারও বললে তিনি বলেন, ব্যবধান তো মাত্র ৭ দিনের, কিন্তু ১৯৬৪ হলে চাকরির ক্ষেত্রে এক বছর সুবিধা পাব। তাছাড়া এক জনের জন্মদিন যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তখন জানা ছিল না। এমনকি অনেক দিন পর্যন্ত খুব অল্প জায়গায়ই জন্ম তারিখ লিখতে হত, ফলে তেমন অসুবিধা অনুভব করিনি আর নিজের জন্মদিন সব সময়ই ২৫ ডিসেম্বর পালন করে এসেছি। সেই অর্থে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত ০২ জানুয়ারি আমার জন্য ছিল উড়ে এসে জুড়ে বসা এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেটা পালটে যায় ২০০৩ সালের ০২ জানুয়ারি সেভার জন্মের পর। ওর জন্মের বেশ কিছুদিন পরে যখন রেজিস্ট্রি অফিসে গেছি ওর বার্থ সার্টিফিকেটের জন্য, ফর্ম দেখে ভদ্রমহিলা বললেন,
- বাহ, আপনার আর আপনার ছেলের জন্ম দেখছি একই দিন, ০২ জানুয়ারি।
আসলে এর আগে একথা মনেই হয়নি। আর এভাবেই ০২ জানুয়ারি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়, যাকে আর বাধ্য হয়ে নয়, ভালবেসে মনে রাখি।
এভাবেই অনেক দিন বছর পেরিয়ে যায়। সেভা বড় হতে থাকে চোখের সামনে। মনিকা আর ক্রিস্টিনার ধারণা সেভা ওদের চেয়ে বেশি আদরের। তাই সুযোগ পেলেই আমাকে খোঁটা দেয় সেভার প্রতি পক্ষপাতিত্বের জন্য। মনিকাই একদিন বলল, সেভার জন্মদিনেই যত সমস্যা – ওর জন্ম ২০০৩ সালের ০২ জানুয়ারি যা সাধারণত লেখা হয় ০২/০১/০৩ – আর এ দেশে এগুলো যথাক্রমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস আর ইমারজেন্সির নম্বর – যেখানে মানুষ ফোন করে বিপদে পড়লে। মনে পড়ে মনিকার কথা শুনে তখন লিখেছিলাম
জন্মদিন
আজ থেকে অনেক বছর আগে
এই দিনটায় জন্ম নিলো সেভা
তরতরিয়ে এমন বড় হবে
সেই দিনটায় জানতো বল কে বা?
এই মাত্র বছর খানেক আগে
ওর মাথাটা আমার কান ছুয়ে
বালক সুলভ কইত কত কথা
শুনতাম আমি ঘাড়টা একটু নুয়ে
এক বছরেই বেড়েছে হাতে পায়ে
মাথা এখন আকাশ ছুঁই ছুঁই
এই দিনটায় জন্ম নিলো সেভা
বছরের প্রথম মাস তারিখ ছিল দুই
দুই হাজার দুই সবে শেষ
শুরু হোল দুই হাজার তিন
মাস দিন বছরের হিসেবে
লিখি আমি ০১ ০২ ০৩
ফায়ার সার্ভিস পুলিশ ইমারজেন্সী
কাউকে আমার নেই আজ প্রয়োজন
আজকে আমার সেভার জন্মদিন
আজকে শুধুই আনন্দ আয়োজন।
সেটা অবশ্য ২০১৮ সালে, আজ থেকে আট বছর আগে। এখন সেভা আগের সেই ছোট ছেলেটি নেই। রুশরা বলে শিশু সন্তান - ছোট সমস্যা, বয়স্ক সন্তান – বড় সমস্যা। আমি এর সাথে যোগ করি অনেক অনেকগুলো সন্তান অনেক সমস্যা, আর যদি তাদের সাথে অনেক পোষা প্রাণী থাকে তাহলে সমস্যার শেষ নেই। যদিও এটা ঠিক যে আনন্দেরও কমতি নেই। এখন প্রশ্ন হল ছেলেমেয়েদের কোন কাজ বাবা মাকে আনন্দ দেয়। অধিকাংশ বাবা মার কাছে সেটা অবশ্যই ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট, জীবনে তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এর কারণ তাতে বাবা মা চিন্তা মুক্ত হয়, তারা না থাকলে ছেলেমেয়েরা যে বানের জলে ভেসে যাবে না সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হয়। গুলিয়াও সেটাই মনে করে। আমার চিন্তা একেবারেই ভিন্ন। আমি যেহেতু প্রায় সব কাজই নিজের খুশিমত করেছি বা এখনও করি আর স্মৃতিশক্তি প্রখর বিধায় ছোটবেলা দৃশ্যমান, তাই আমার ছেলেমেয়েরা নিজেরা যা চায় আমি মনে করি সেটাই তাদের করা উচিৎ। কারণ জীবন তাদের। যদি একজন মানুষ তার কাজ থেকে আনন্দ না পায় তাহলে তাতে সে যত পয়সাই পাক, জীবনে সুখী হবে না। একটা দুঃখ থেকেই যাবে যে ঠিক যা হতে চেয়েছিল সেটা হতে পারল না। তাই আমি ওরা যা চায় সেটাতেই সায় দেই আর সাধ্যমত সাহায্য করি। এর ফলাফল যে ভালো হয়েছে সেটা বলতে পারব না, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমার লাই পেয়ে প্রায় কেউই শেষ পর্যন্ত তাদের মেধার বিকাশ করতে পারেনি। যদি সেভার কথা বলি, এক সময় অংক খুব পছন্দ করত। আমার দিক থেকে সব রকমের সহায়তা ছিল। একই সাথে ভায়োলিন ও পিয়ানো বাজাত ভালো। সঙ্গীত বিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ খুব পছন্দ করতেন। কিন্তু কোন এক সময়ে এক শিক্ষকের সাথে সমস্যার ফলে ওসব বলতে গেলে বাদ দেয়। এখানে আমার দোষ মনে হয় আমি ওদের সব সময়ই দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ দেই। সব শিক্ষক সেটা ঠিক মানতে পারেন না। সে সময় ও ফুটবল খেলার দিকে ঝুঁকল। আমি পক্ষে মত দিলাম। ফুটবল আর মিউজিকের টানাপোড়ন থেকেই শিক্ষকের সাথে ঝামেলা হয়েছিল। ও সঙ্গীত বিদ্যালয়ে যাওয়া বাদ দিল। তারপর এক সময় খুব আগ্রহ দেখা দিল কসমোলজির উপর। ইউ টিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখত, আমিও নামকরা কসমোলজিস্টদের লেকচার পাঠাতাম। সেটা কাটলে ফিলোসফির প্রতি আগ্রহ জন্মাল। কান্ট, সোপেনহাউয়ার এদের পড়তে শুরু করল। কিন্তু আসল যেটা মানে একাডেমিক পড়াশুনা লাটে উঠল। এরমধ্যে অবশ্য মন্তাঝের উপর কলেজ শেষ করল। চিপ তৈরি করা এদের মূল কাজ। তবে শেষ করেই বলল এ লাইনে কাজ করবে না, যদিও যুদ্ধ শুরু হবার পর এদের বেশ চাহিদা। এরপর একদিন আমাকে মেসেজ করে দিল। আমার এমনিতে শরীর ব্যথা। আগেও দিত। তবে এখন দেখি সাথে সাথে আমাকে মানুষের এনাটমি নিয়ে বলছে। তখন জানলাম ও মেসেজের উপর একটা কোর্স শেষ করেছে। ইদানিং লেগেছে গাছপালার পেছনে। ওর ঘর এখন ছোটখাটো গ্রীন হাউজ। গোলাপ দিয়ে ভর্তি। সাথে শশা, টম্যাটো, বিভিন্ন শাঁক। এমনকি প্যাসিফ্লাউফার, লেবু, কমলালেবু এসব লাগিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে। এখন ওর জল আর বিদ্যুতের বিল দিতেই আমার হিমশিম অবস্থা। এমনকি কয়েক দিন আগে পুলিশ এসেছিল। ধারণা করছি হয়তো প্রায় সারাদিন এত আলো জ্বলতে দেখে কেউ রিপোর্ট করেছিল আর এখানে নিষিদ্ধ কিছু চাষ হয় কিনা সেটা দেখতে ওদের আগমন। এছাড়া আছে ভায়োলিন। হ্যাঁ, এখনও ভায়োলিন ওর খুব পছন্দ। ইউ টিউবে দেখে দেখে নিজেই বাজায়। বলেছিলাম পুরানো শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করে আবার শিখতে, রাজী না, বলে নিজে নিজেই শিখবে যেমন শেখে ঘরে বিভিন্ন শাঁক সব্জি ফুল ফলের চাষ। বলেছিলাম ও যেন এগ্রিকালচার নিয়ে পড়াশুনা করে, না, করবে না। বলে অযথা সময় নষ্ট। এটা নাকি ইউ টিউব থেকেই শেখা যায়। তবে চাইলেও ভর্তি হতে পারবে না। এখানে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। ওর ক্লাসমেটরা যখন দল বেঁধে সেখানে নাম লেখায়, বয়সের কারণে ও যেতে পারেনি। পরের বছর যখন যাওয়ার কথা ছিল তখন কোভিড-১৯ এর তাণ্ডব চারিদিকে। তাই আর করা হয়নি। এরপর যুদ্ধ লাগল। ফলে আমরা নিজেরা এখন আর ওখানে যেতে আগ্রহী নই। আসলে এই সমস্যা অনেক ফ্যামিলির, বিশেষ করে যখন ছেলেরা নিজেরাই সামরিক প্রশিক্ষণে আগ্রহী নয়। আর যদি আঠার বছর পূর্ণ হবার পর কারও মিলিটারি আইডেন্টিটি কার্ড (এই কার্ড প্রশিক্ষণের আগেই দেয়, এটা আসলে এক ধরণের হিসেব রাখা) না থাকলে তার পক্ষে কোথাও ভর্তি হওয়া বা অফিসিয়ালি কোন কাজে ঢোকা অসম্ভব। তাই আমরা অপেক্ষায় আছি ইউক্রেন যুদ্ধ কবে শেষ হবে। তাহলে হয়তো ঐ কার্ড পাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নিজে যেহেতু শিক্ষকতা করি তাই সেভা একাডেমিক পড়াশুনা না করলেও আমি হতাশ নই। অভিজ্ঞতা বলে এখন ছেলেমেয়েরা ইনকাম ওরিয়েন্টেড তবে অনেকেই সেটা করতে চায় নিজের শর্তে। যার ফলে ফ্রি ল্যান্সার এত জনপ্রিয়। সেভা বিভিন্ন কাজ জানে। টাকার দরকার হলে বিজ্ঞাপন দিয়ে কয়েকদিন কাজ করে, আবার নিজের হবি নিয়ে পড়ে থাকে। অবশ্য আমি সবসময় সাহায্য করি আর মনে করিয়ে দেই আমি অমর নই। এ নিয়ে গুলিয়া চিন্তিত, মনিকা বলে আমার জন্যই সেভা এমন। আমার কিন্তু সেভাকে হিংসা করতে ইচ্ছা করে। অনেক কিছু পারে, সবচেয়ে বড় হাতেকলমে করতে পারে। ঘরে রিপেয়ারিং করা দরকার ঠিক করে ফেলবে। ইলেক্ট্রিসিটি ও স্যানিটারি সংক্রান্ত অনেক কাজ আমি পারি, অন্তত ফিজিক্সটা জানি। এসব বিষয়ে আমার সাহায্য নেয়। তবে ও যত একাগ্রতা নিয়ে কোন কাজ করে আমার সেটা হয় না। অন্যদিকে আমি যেমন চল্লিশ বছর ধরে ফিজিক্স নিয়েই কাজ করতে পারি, সেভা খুব বেশি দিন কোন বিষয়ে আগ্রহ ধরে রাখতে পারে না। আর অনেক টাকা পয়সা করতে হবে এমনটা ভাবে না। যেটা আমি নিজেও পছন্দ করি। আমি যদি প্রচণ্ড অগোছালো হই, সেভা খুব ফিটফাট। আমার ধারণা ও যদি আর দশজনের মত হত, মানে একাডেমিক পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত তাহলে আমার অনেক কিছুই জানা হত না। কারণ ছাত্রজীবনে আমি বুঝতে পারতাম না কীভাবে ক্লাস ফাঁকি দেয়া যায় বা পড়াশুনা খারাপ করা যায়, এখন আমি বুঝি আমরা যেটাকে সঠিক পথ মনে করি সেটাই একমাত্র পথ নয়, এর বাইরেও হাজারটা পথ আছে এবং সেসব পথে চলেও জীবনে আনন্দ পাওয়া যায়। আর কেউ অন্যের ক্ষতি না করে শুধু নিজের কাজটা ঠিকঠাক করেই সমাজ তথা দেশের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০২ জানুয়ারি ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment