বিজন ভাবনা - (৪) বৈষম্যের এক বছর

দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল। কারও জন্য এটা সফল্যের বছর, কারও জন্য ব্যর্থতার। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কেন দেশের বেশির ভাগ জনগণের অংশগ্রহণে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রায় সবার জন্য অভিশাপ হয়ে নেমে আসল? কেন হাজার অনিয়ম অবিচারের পরেও কমবেশি আধুনিক একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল? তার আগে আমরা জেনে নেই সাফল্য বলতে আমরা কি বুঝি।

সাধারণ ভাবে বললে সফল্য হল কোন পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন। তবে যদি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দেখি তখন সাফল্য হল এক ধাপ থেকে অপেক্ষাকৃত উচ্চ ধাপে যাওয়া কেননা বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, আছে শুধু অন্তহীন পথচলা। এটা শুধু বিজ্ঞানে নয়, ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনেও। একটি শিশু যখন হাঁটতে শেখে তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপই সাফল্য, কিন্তু সেটা যদি সেখানে থেমে থাকে তাহলে এই সাফল্যই এক সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। আবার যদি কারও চাকরিতে প্রমোশন না হয় তাহলে চাকরিতে ঢোকার সময় যেটা ছিল সাফল্য সেটা হবে স্থবিরতা বা এক অর্থে ব্যর্থতা। এই আলোতেই আজ ২০২৪ এর আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করা যাক। আর সেজন্য আমরা শুরু করব ঘোষিত লক্ষ্যগুলি থেকে। যেহেতু পরবর্তীতে জানা গেছে সেটা ছিল মেটিকুলাস প্ল্যানের অংশ তাই ধরে নিতেই পারি ঘোষিত লক্ষ্য উদ্দেশ্যের বাইরেও কিছু ষড়যন্ত্র ছিল যা জনগণকে কখনোই জানানো হয়নি। তাই মানুষ আন্দোলনকারীদের ঘোষিত ইশতেহারে বিশ্বাস করেছিল আর সেটা করেছিল বলেই তারা হাজারে হাজারে রাস্তায় নেমেছিল সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। কি সেই লক্ষ্য? অনেকগুলো লক্ষ্যের একটি ছিল দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশে সেভাবে কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেটা সত্য কিন্তু মানুষের কাছে গণতন্ত্রের আবেদন সব সময়ই ছিল আর তাই সে বার বার জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে। লড়াই করেছে ভোটের অধিকারের জন্য, ভোট দিয়ে সরকার গঠনের জন্য। যদিও কোন সরকারই তাদের জীবনে তেমন কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি তারপরেও মানুষ বার বার এদের নেতা মেনেছে, এদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। আর এই নেতারা জনগণের সমর্থনকে পুঁজি করে নিজেরা ক্ষমতা ও ধন সম্পদের মালিক হয়েছে। আগেও তাই ছিল, এখনও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি কী ১৯৪৭, কী ১৯৭১, কী ১৯৯০, কী ২০১৩, কী ২০২৪ – সব সময় সাধারণ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চেয়েছে আর বার বার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। সেই বিচারে সমস্ত সাফল্যই ছিল আপেক্ষিক, কোন কোন সাফল্য ব্যর্থতায় ভরা।

২০২৪ এর আন্দোলনে জনসমর্থনের মূল কারণ ছিল ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়া, দেশকে সুস্থ রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে আনা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে সেসময় দেশে সাধারণ মানুষের ভাতের সমস্যা অনেকটাই মিটে গেছিল, অর্থনৈতিক ভাবে মানুষ কিছুটা হলেও এক ধরণের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছিল। হয়তো বা বড় বড় ব্যবসায়ী বা ব্যাঙ্কারদের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন ছিল, তবে এত অর্থ পাচার, এত অনিয়মের পরেও সাধারণ মানুষের জন্য সময়টা একেবারে খারাপ ছিল না। মানুষের কিছু একটা করে খাওয়ার উপায় ছিল, বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ সরকারি অনুদান পেয়েও কোন মতে দিনাতিপাত করছিল। তাই সরকার পতনের পরে এ আশা অনেকেই করেছিল যে অর্থ পাচার, স্বজনপ্রীতি বন্ধ হয়ে মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো হবে, মানুষ নিজে ভোট দিয়ে নিজের পছন্দের সরকার ক্ষমতায় আনবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা হল এসবের কিছুই অর্জিত হয়নি। যদি স্বৈরাচারকে দূর করাই একমাত্র লক্ষ্য হয় তাহলে বলব – সেটাও হয়নি। আওয়ামী বা হাসিনার স্বৈরাচার দূর হয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় এসেছে নতুন স্বৈরাচার, নতুন নামে, নতুন বোতলে। বর্তমান মব কালচার দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিত যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর পেছনে যে অবজেক্টিভ কারণ ছিল না তা নয়, তবে তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা খুব একটা দেখা যায়নি, যাচ্ছে না। বরং মনে হয় ইচ্ছে করেই সমাজে এই অনিশ্চয়তা, এই অরাজকতা টিকিয়ে রাখা হচ্ছে নিজেদের অঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জন করার জন্য।

দেশের বর্তমান ঘটনার সাথে আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘটনার বেশ কিছু মিল খুঁজে পাই। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। এর অনেক কারণ ছিল, তবে অন্যতম প্রধান কারণগুলোর একটা আমার মনে হয় বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকা থেকে সরে গেলে এমন কোন রাজনৈতিক শক্তি ছিল না যে দেশকে পথ দেখাতে পারে। ফলাফল আমরা জানি। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে গিয়ে রাজনীতি নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে আওয়ামী লীগের সরকারের পতন ঘটলেও কোন রাজনৈতিক দল সেই শূন্যস্থান দখল করতে পারেনি। সেই জায়গা দখল করেছে মৌলবাদী ও সুবিধাবাদী চক্র। তাদের হিসেবে জনগণ কখনই ছিল না, জনগণ তাদের জন্য শুধু সংখ্যা। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙার পরে ইয়েলৎসিনের সাথী গাইদার, চুবাইসরা সে দেশের সমস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান হয় জলের দামে বিক্রি করে না হয় ধ্বংস করে। তাদের নিজেদের ভাষায় – যাতে সমাজতন্ত্র আর ফিরে আসতে না পারে। এই যে গত এক বছরে দেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত সব কিছু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বা এখনও হচ্ছে তার উদ্দেশ্যও একটাই – মানুষের স্মৃতি থেকে একাত্তর মুছে ফেলা, মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শ থেকে ফিরিয়ে ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের মাদকতায় বিভোর করে রাখা।

নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে দাবীদার অনেক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর অন্ধ আওয়ামী বিরোধিতার সুযোগ নিয়ে বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ও তাদের দোসররা যতটা না আওয়ামী লীগের তারচেয়েও গভীর করে একাত্তরের কবর খুঁড়ছে। তারপরেও কি এক অজানা কারণে তারা একাত্তর বিরোধী কাজকর্মের বিরদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না। দেশের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ বিরোধীদের দখলে চলে গেছে। এর দায়িত্ব যে মূলত আওয়ামী লীগের তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু শুধু আওয়ামী লীগকে দোষ দিলে কি শেষ রক্ষা হবে? আমার তো মনে হয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম সবাই অন্ধ ভাবে এক অন্যকে দোষ দিয়ে শুধু নিজেদের অবস্থানই দুর্বল করেনি, বরং জামাত শিবিরের সামনে ক্ষমতায় উত্তরণের দোর খুলে দিয়েছে। এভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের স্বাধীনতা, বাহাত্তরের সংবিধান ইত্যাদি থেকে দূরে সরে এসেছি, না এলেও মাথা উঁচু করে প্রতিবাদ করতে সক্ষম হইনি। সিপিবির অন্ধ আওয়ামী বিরোধিতা এখন রাজনৈতিক ভাবেও তাদের অন্ধ করে দিয়েছে। শেখ মুজিব সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দিয়ে শুরু করলেও সমস্ত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে বাহাত্তরের সংবিধানের মত একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে পেরেছিলেন, অনেক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও নিজেকে একজন প্রগতিশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আমাদের বন্ধুরা প্রগতিশীল রাজনীতি দিয়ে শুরু করে এখন প্রতিক্রিয়ার প্রধান লিবারেল হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বৈষম্য বিরোধী স্লোগান দিয়ে শুরু হলেও সাম্প্রদায়িক সমস্যা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র। যে কোটা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার জন্য এই আন্দোলন শুরু আজ সেটা নতুন করে শুরু হয়েছে আর কোটার সুযোগ পাচ্ছে অন্য পক্ষ। এক কথায় দেশের শুধু মালিকানা বদল হয়েছে - ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, অনিয়মের বাম্পার ফলন আগের মতই চলছে।

তবে গতকাল মধুর ক্যান্টিনে নতুন স্লোগান

"তুমিও জানো আমিও জানি
জামায়াত শিবির পাকিস্তানী"

কিছুটা হলেও আশার আলো জাগায়। ২০১৩ সালে শাহবাগের "তুই রাজাকার" এর পরে এটা মনে হয় বাংলাদেশের পক্ষের অন্যতম প্রধান স্লোগান। স্লোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। আমাদের এক সময়ের প্রাণপ্রিয় সংগঠন। এক সময়ের বলছি এ কারণে যে গত এক বছরে ছাত্র ইউনিয়ন তো বটেই সিপিবি সহ বিভিন্ন বাম দলের ভূমিকা অনেকের মনেই এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে "সখী তুমি কার?" এই স্লোগান শুধুই সাময়িক আবেগ নাকি স্মৃতিভ্রষ্ট বামদের একাত্তরের স্মৃতি ফিরে পাওয়া - সেটা সময় বলবে। তবে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে তাদের শেষ পদক্ষেপ, জামায়াত শিবির বিরোধী স্লোগান - এসব দেখে মনে হয় অন্ধ আওয়ামী বিরোধী টনিকের নেশা দেরিতে হলেও তাদের ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। বেটার লেট দ্যান নেভার।

প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন বৈষম্যের এক বছর। কারণ খুব সোজা। সত্যবাদী হতে হলে সারা জীবন সত্য বলতে হয়, মিথ্যেবাদী হবার জন্য একবার মিথ্যা বলাই যথেষ্ট। প্রথমে কোঠা নিয়ে আন্দোলন হলেও পরে সেটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন নাম পায়। সেখানে ব্যাপক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। মানুষ ভেবেছিল এটা ১৯৬৯, ১৯৯০ বা ২০১৩ সালের মতই স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থান। কিন্তু যে মুহূর্তে জাতিকে জানানো হল যে এর পেছনে মাস্টারমাইন্ড আছে, আছে মেটিকুলাস প্ল্যান তখন সবই পরিষ্কার হয়ে গেল। মানুষ এখানে ষড়যন্ত্রের আঁচ পেল। আসলে স্বতঃস্ফূর্ত আর সুপরিকল্পিত – ধারণা দুটো ভিন্ন পথের পথিক। যার শুরু মিথ্যা বা ধোঁকা দিয়ে তা আর যাই হোক দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। একজন মানুষের জন্য যেমন একটি জাতির জন্য তেমনি স্বাধীনতা অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালি জাতির ইতিহাসে তাই সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। এই স্বাধীনতাকে যারা অস্বীকার করে, এই স্বাধীনতা যারা প্রশ্নের মুখোমুখি করে তারা আর যাই হোক দেশ ও জাতির বন্ধু হতে পারে না।

বাংলাদেশের মানুষ বারবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব অন্যায়কে ছুঁড়ে ফেলেছে। এখনও তারা পারে, দরকার শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম জোট সহ স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তির বাংলাদেশের পতাকা তলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংবিধানের বিরুদ্ধে চক্রান্ত রোধ করা ও দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পথ তৈরি করা। এসমস্ত রাজনৈতিক দলের পরস্পরের পরিপূরক হয়ে কাজ করা ও মনে রাখা ক্ষমতা সাময়িক কিন্তু বাংলাদেশ চিরজীবী। এখন এদের একটাই স্লোগান হওয়া উচিৎ
- “মব আর অপরাজনীতি হটাও, দেশ বাঁচাও”।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৮ আগস্ট ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (৪): বৈষম্যের এক বছর-বিজন সাহা https://share.google/WGLIF1UfuKxH5VcWY

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট

বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন