বিজন ভাবনা - (১৩) বই পড়া

এরকম প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায় যে বই পড়ে কি মানুষ সত্যিই মানুষ হতে পারে? মানে ভালো মানুষ হবার পেছনে বইয়ের ভূমিকা কতটুকু। কারণ প্রচুর শিক্ষিত মানুষ আমরা চারপাশে দেখি যাদের মন মানসিকতা, যাদের সমাজ ভাবনা মনবতার ধারে কাছে যায় না। শুধু তাই নয় সমাজে বা দেশে যত বিপর্যয় নেমে আসে তার বেশিরভাগের পেছনে থাকে এই শিক্ষিত লোকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণ। এই পড়ুয়া মানুষই যারা পড়ে না বা পড়াশুনা জানে না তাদের বিভিন্ন ভাবে ম্যানিপুলেট করে নিজেদের স্বার্থে। এটা আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে এটাও ঠিক বিভিন্ন বিপর্যয়ের পাশাপাশি সমাজে যাকিছু ভালো, মানব সভ্যতার যাকিছু অর্জন সেটাও হয়েছে এই পড়ুয়া লোকদের হাত ধরেই। তাই এখানে বইয়ের চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে সেই মানুষ যে বই পড়ে বা পড়ে না, কিন্তু যার মধ্যে আছে নতুনকে গ্রহণ করার বা গ্রহণ না করলেও নতুন কিছু শোনার মত একটি মুক্ত মন।

যদিও আজকাল আমরা পড়া বলতে মূলত বই পড়া বুঝি, কিন্তু সেটা কি সত্যিই তাই? যখন বই ছিল না তখনও তো মানুষ পড়ত। হ্যাঁ সে প্রকৃতিকে পড়ত। আসলে প্রকৃতিকে পড়ে মানুষ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করত সেটা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার তাগিদ থেকেই বইয়ের আবিষ্কার। তাই পড়া মানে শুধু বই পড়া নয় যেকোন কিছু পড়া বা বলতে পারেন কোন কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা। তবে বইয়ের মধ্য দিয়ে আমরা অন্যের অভিজ্ঞতা, অন্যের ভাবনার কথা জানতে পারি যা আমাদের অজানা। আর অজানাকে জানাই তো উৎসুক মানুষের প্রধান ধর্ম। সেখানে শুধু হিরো থাকে না, ভিলেনও থাকে। তাই কি গ্রহণ করব আর কি বর্জন করব সেটা নির্ভর করে প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ চাহিদার উপর। বই পড়ে কেউ বিনয়ী হবে কিনা সেটা নির্ভর করে যে পড়ে তার মানসিকতার উপরে। কোটি কোটি মানুষ একটি বা কয়েকটি গ্রন্থের পাঠক হয়ে মানবতা বিপন্ন করছে ধর্মের নামে আবার অসংখ্য মানুষ বই পড়ে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ তারা থেকে শুরু করে মহাকাশের রহস্য উদ্ঘাটন করছে। তাই বইয়ের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। আসল কথা আপনি কি খুঁজছেন বইয়ের পাতায় - জ্ঞান নাকি আপনার কাজের জাস্টিফিকেশন। বই মানেই অন্যের ভাবনা। যদি জীবন সম্পর্কে নিজস্ব ভাবনা না থাকে তাহলে অন্যের ভাবনা দ্বারা প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা আছে। তবে অন্যের ভাবনা তা সে যত ভালোই হোক না কেন সেটা অন্যের জুতা। সেটাতে আপনি স্বচ্ছন্দ বোধ তখনই করবেন যখন তাকে নিজের বোধ, বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজের মত করে গড়ে নিতে পারবেন। চরিত্র গঠনে বই সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে তবে তা কেমন হবে তা নির্ভর করে নিজস্ব জীবনদর্শনের উপর।

আপনি যদি বইয়ের পাতায় আপনার প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন তাহলে তা নাও পেতে পারেন, কারণ সেটা হবে অন্যের দর্শন। কিন্তু আপনি যদি বই পড়ে প্রশ্ন করতে শেখেন তাহলে সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়। বই হল সাথী যে আপনার চলার পথটাকে আনন্দদায়ক অথবা সহজ করতে পারে। তবে চলতে হবে আপনাকেই আর লক্ষ্যটাও আপনাকেই ঠিক করতে হবে।

রবীন্দ্রনাথকে কেউ প্রশ্ন করে না তিনি কোন কলম দিয়ে লেখেন। অন্যদিকে ফটোগ্রাফারকে প্রায় সবাই প্রশ্ন করে তার ক্যামেরা সম্পর্কে। এ নিয়ে রাশিয়ার ফটোগ্রাফারদের মধ্যে একটা গল্প চালু আছে। এক নামকরা ফটোগ্রাফার গেছে বন্ধুর বাসায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। সাথে নিয়ে গেছে বেশ কিছু ছবির এলবাম। দেখে বন্ধু পত্নী বললেন

এত সুন্দর ছবি। আপনার নিশ্চয়ই খুব দামী ক্যামেরা?

খাওয়া দাওয়া গল্পগুজব শেষে ফটোগ্রাফার জামাকাপড় পরে বলল

রান্নাটা কিন্তু অপূর্ব। আপনার বাসনকোসন নিশ্চয়ই খুব দামী?

গল্পটা নতুন যারা ফোটোগ্রাফি শিখতে আসে আর ক্যামেরা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় তাদের বলা হয় এটা বোঝানোর জন্য যে ক্যামেরা ছবি তোলে না, ছবি তোলে মানুষ। দেখার চোখ ও কম্পোজিশন জ্ঞান না থাকলে কোন ক্যামেরাই ভালো ছবি দেয় না।

আমার ধারণা বই পড়ার ক্ষেত্রে একই কথা বলা যায়। মনে প্রশ্ন না থাকলে, জানার আগ্রহ না থাকলে শিশু যে বইই পড়ুক না কেন সেখানে যা লেখা তাই হবে প্রদত্ত বাণী। ছোটবেলায় আমাদের কাছে বই মানেই ছিল পূজনীয় আর অনেকের কাছে আরবি অক্ষর মানেই পবিত্র। সত্যি কথা বলতে কি দেশে থাকতে যেটুকু আরবি শুনতাম সেটা ছিল কোরআনের বাণী। কিন্তু যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে এলাম, সেখানে অনেক আরবদের সাথে আলাপ হল আর দেখলাম অন্যান্য ভাষার মত আরবি ভাষায়ও ঠিকই গালিগালাজও করা যায় আর তখন বুঝলাম পবিত্র ভাষা বলে কিছু নেই, ভাষা কেমন হবে সেটা নির্ভর করে সেই ভাষায় মানুষ কি বলছে তার উপর। একই ভাবে বই কেমন সেটা নির্ভর করে বই থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কেমন মানুষ হয়েছি বা হচ্ছি তার উপর। দোষটা যতটা না বইয়ের তারচেয়ে বেশি পাঠকের। কারণ বইয়ে যাই লেখা থাক না কেন পাঠকই তাকে প্রাণ দেয়, বইয়ের ভাষাকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে আর সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী জীবনে তা প্রয়োগ করে। তাই বই যাতে সমাজে পজিটিভ ভূমিকা রাখতে পারে সেজন্য সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। বিশ্বাস ও যুক্তির মধ্যে অনুপাতের গোল্ডেন রেশিও ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা শুধু পড়ায় নয়, সর্বক্ষেত্রে। কীভাবে বেশি মানুষকে এপথে আনা যায়? পরীক্ষার নম্বর যেখানে জ্ঞানের মাপকাঠি সেখানে সমাজ না বদলিয়ে গল্পের বইয়ের বিশাল জগতে শিশুদের ঘুরতে নিয়ে আসা অসম্ভব। এজন্যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাঁজাতে হবে। অন্ধ বিশ্বাস নয়, অবিশ্বাসকে করতে হবে শিক্ষার মূলমন্ত্র যেন সেই অবিশ্বাস থেকে প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠক নিজের সত্য আবিষ্কার করতে পারে। তবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থেকেও কেউ অসুস্থ হয়েছে বলে আমরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা যেমন বন্ধ করি না, একই ভাবে আমরা ভালো বই পড়াও বাদ দেব না। কারণ ভালো বই, যা মানুষকে ভালবাসতে শেখায়, মানুষকে মানবিক হতে শেখায় তা সবাইকে মানবিক করতে না পারলেও অনেককেই সত্যিকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাছাড়া পড়ার সাথে আরও একটা বিষয় জড়িত - বোঝা! বোঝা আর পড়ায় মিল হলে তবেই তো বোঝাপড়া হয়, নাহলে পড়াটা বোঝা হয়েই রয়ে যায়। আমরা প্রকৃতিকে জানতে চাই, তাকে পর্যবেক্ষণ করি। এবং নিজের নিজের অভিজ্ঞতা ও জানার গভীরতার উপর ভিত্তি করে তাকে ব্যাখ্যা করি। এভাবেই জন্ম নেয় বিভিন্ন তত্ত্ব। পড়ার ক্ষেত্রেও তাই। একই বই বিভিন্ন মানুষ পড়ে বিভিন্ন ভাবে তার ব্যাখ্যা করে। তাই দিনের শেষে মানুষটাই আসল, তাকেই ঠিক করতে হবে বই তাকে মানুষ হতে সাহায্য করবে না অমানুষ!

বিঃদ্রঃ লেখাটি ১০ অক্টোবর ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

বিজন ভাবনা (১৩): বই পড়া– বিজন সাহা https://share.google/6qJJ3A4N81fYdepNK  

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট

বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন