বিজন ভাবনা - (২৩) ডিসেম্বর
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। বাংলার, বাংলাদেশের স্মরণকালের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা ঘটেছে এই মাসেই, ঘটেছে একই বছরে, ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইতিহাসে প্রথমবারের মত বাঙালি পেয়েছে নিজস্ব মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত - একান্ত নিজের এক রাষ্ট্র। কিন্তু এই বিজয়ের গৌরবময় মূহুর্তের মাত্র দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি হারিয়েছে তার এক দল প্রতিভাবান সন্তানকে যারা দীর্ঘ নয় মাস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটু একটু করে এই বিজয়কে এগিয়ে এনেছেন, যাদের হাত ধরেই নবজাতক রাষ্ট্রের পথ চলার কথা ছিল।
১৬ ডিসেম্বর ছিল বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনেই দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম সাফল্যের মুখ দেখেছিল কোটি কোটি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। তবে ২০২৫ সালে জাতি বিজয় দিবস কতটুকু পালন করছে আর কতটুকু বিজয়ের অর্জন ধূলায় লুন্ঠিত হচ্ছে বিজিতদের হাতে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিজিতরা বরাবরই ঐক্যবদ্ধ প্রতিশোধের নেশায়, বিজয়ীরা প্রথম থেকেই দ্বিধাবিভক্ত ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। এমনকি এই বন্টনে ন্যায্য ভাগ পায়নি বলে যারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে তাদের অনেকেই আদর্শিক শত্রুর সাথে হাত মিলিয়েছে। অবস্থা অনেকটা বৌয়ের সাথে রাগ করে সব ভাত অন্য বাড়ির কুকুরকে দিয়ে খাওয়ানোর মত আর কি! ফলাফল - ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। বিজয় আজ সুদূর অতীত। যে জাতির বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা বিজয়ের মূল্যায়ন করতে পারে না, বিজয়ের মালা সে জাতির কাছে গলার ফাঁস। সব দেখে মনে হয় দেশের রাজনীতিবিদরা এখন এই ফাঁস খুলে বদ্ধপরিকর। আর তাই তো মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্মৃতি একের পর এক ধ্বংস করা হচ্ছে আর যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের শরীক বলে মনে করে তারাও বিভিন্ন অজুহাতে সেটা সমর্থন করে যাচ্ছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে কেমন ছিল ২০২৫ এর বিজয় দিবস? রাশিয়ায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় সম্পর্কে বলা হয় চোখের জলে ভেজা বিজয়, সে অশ্রু একদিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া দেশবাসীর জন্য কষ্টের অশ্রু, অন্যদিকে তা একই সাথে যুদ্ধ শেষ হবার আনন্দাশ্রু। বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার মনে হয়েছে দুঃখের বোঝাটাই ভারী, বিশেষ করে এই বিজয়কে যারা হৃদয়ে লালন করে, মননে ধারণ করে।
বিজয় দিবসের ঠিক দুই দিন আগেই ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বাঙালির ইতিহাসে মনে হয় সবচেয়ে কালো দিন। সারা বছর ধরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা বাংলাদেশকে মেধা শূন্য করেছে। কেন? কারণ বাংলার শিক্ষিত সমাজই সবার আগে পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলেছে। শিক্ষিত বাঙালিই প্রথম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছে। ছাত্র সমাজই প্রথম উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাকিস্তানের জন্ম ধর্মের ছত্রছায়ায়। সেদিক থেকেই জন্মের আগেই তার মুসলমানি হয়ে গেছিল। আর ধর্মভিত্তিক সমাজে শিক্ষাকে অনুৎসাহিত করাটা প্রত্যাশিত ছিল। কারণ শিক্ষা ধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু। শিক্ষা মানেই জানার আগ্রহ, শিক্ষা মানেই প্রশ্ন, শিক্ষা মানেই পুরানোকে অস্বীকার করে নতুনের সন্ধান করা। আর এ কারণেই ধর্মভিত্তিক সমাজ সবসময়ই শিক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখে। এই সন্দেহের কারণেই এক সময় ভারতের মুসলিম সমাজ পশ্চিমা বা ব্রিটিশ শিক্ষা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেছিল। আপাত দৃষ্টিতে সেটা পশ্চিমা শিক্ষা বিরোধী মনে হলেও এর মূল কারণ ছিল শিক্ষার প্রতি অবিশ্বাস। যদি ধর্মীয় শিক্ষা শুধু ধর্ম গ্রন্থ মুখস্থ করা এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে আধুনিক শিক্ষা মানে সত্যের সন্ধান করা, প্রচলিত সত্যকে প্রশ্ন করা। আর এটা সব রকম ধর্মের সাথেই সাংঘর্ষিক। তাই বাংলাদেশের বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা যে পাকিস্তানের শাসক ও ধর্মীয় দলগুলোর বিরাগভাজন হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। যত দিন পর্যন্ত তারা একাত্তরের এই যুদ্ধে নিজদের বিজয়ের সম্ভাবনা দেখত ততদিন তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলেও সেটা করত গোপনে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চক্ষুর আড়ালে। কিন্তু যখন তারা নিশ্চিত হয় যে পরাজয় অবধারিত, তখন আর রাখঢাকের প্রয়োজন ছিল না, ছিল প্রতিশোধের দুর্বার নেশা যাতে বিজয়ী বাঙালি সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। বিগত অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস বলে এ কাজে তারা শুধু সফলই হয়নি, আশাতীত ভাবে সফল হয়েছে। যার ফলে যে ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের সংগ্রামের শুরু, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমরা তাকে সেই অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এমনকি আমরা কি সত্যিই এই স্বাধীনতা চাই কিনা সেই সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারিনি।
আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে আচ্ছা আমরা কেন ভাষা আন্দোলন করেছিলাম, কেন ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছিল? ভাষা কি জন্যে দরকার যদি আমরা সেই ভাষায় স্বাধীন ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারি? আমরা কি সত্যিই নিজেদের কথা মন খুলে বলতে পারি? পারলে কেন মুক্তমনা কবি, সাহিত্যিক, লেখক, ব্লগার স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে না? কেন তাদের দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয় নিরাপত্তার জন্য? স্বাধীনতার আগে দেশের সম্পদ পাচার মত পশ্চিম পাকিস্তানে। এখন সেটা চলে যায় ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশে। তাহলে কেন এই বিজয়? দীর্ঘ চব্বিশ বছরের সংগ্রাম ছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য, কিন্তু বাস্তবে শুধু মালিকের পরিবর্তন হয়েছে, বিদেশী লুটেরার জায়গা দখল করেছে দেশী লুটেরা। তবে লুটেরা স্বদেশী সরকার সব সময়ই ছিল, সব আমলেই ছিল। কতবার ধোঁকা খেলে মানুষ বুঝবে যে নিজেদের অধিকার নিজেদেরই আদায় করতে হবে যেমনটা সে করেছিল একাত্তরে?
লুটেরা হোক আর যাই হোক এতদিন পর্যন্ত দেশের সব সরকারই চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকতে। কষ্ট করে হলেও রাষ্ট্রের আইন মানে সংবিধান মেনে চলার চেষ্টা করেছে। আর এ জন্যেই সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলে সবার আগে সংবিধান স্থগিত করে। এই প্রথম বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহী সরকার ক্ষমতাসীন। কারণ রাষ্ট্র মানে ভূমি বা জনগণ নয়, সবার আগে সংবিধান, রাষ্ট্রের ইতিহাস। যে সরকার উঠতে বসতে সংবিধান লঙ্ঘন করে, যে সরকার নির্লিপ্ত ভাবে দেশের ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করতে দেয় সে সরকার যে রাষ্ট্রদ্রোহী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেই বলার চেষ্টা করে বর্তমান সরকার একাত্তর নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না বা একাত্তর নিয়ে বর্তমান সরকার আগ্রহী নয়। সব সরকারের যে সব বিষয়ে একই রকম আগ্রহ থাকতে হবে তার কোন মানে নেই। তবে রাষ্ট্রের ইতিহাস রক্ষায় সব সরকার দায়বদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যাকে বাদ দিয়ে দেশ থাকে না। বর্তমান সরকার এখানে ব্যর্থ। আমি তো বলব তার নির্লিপ্ততা, তার নিষ্ক্রিয়তা দেশের সেই ইতিহাস মুছে দেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই আগ্রহ নেই বলাটা আসলে তাদের বয়ানকে জাস্টিফাই করা যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে না। সাধারণ মানুষ তাদের বলে রাজাকার। আর রাজাকার মানেই পাকিস্তানের দোসর। একেই বলে পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করা। পাকিস্তান দিয়ে শুরু করে লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করে আবার পাকিস্তানেই ফিরে আসা। এটাই ২০২৫ এর ডিসেম্বর যখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে গিয়ে পর্যন্ত সার্কাসের অবতারণা করেন। পরের বার ওখানে ক্লিনটন বা ওবামাকে দাড় করিয়ে রাখতে হবে যাতে তিনি এ ধরণের ক্যারিকেচার করার ফুসরত না পান।
রাষ্ট্র হওয়া উচিৎ শুধু ধর্মনিরপেক্ষ নয়, দলনিরপেক্ষও। কারণ সরকারি দলের কর্মীরা যখন রাষ্ট্র থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা পায় সেটার ধর্মীয় রূপ কোন ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব। বিরোধী আসনে থাকার সময় প্রতিটি দলই চায় রাষ্ট্র যেন দলনিরপেক্ষ হয় যদিও ক্ষমতায় গেলে তা ভুলে যায়। তবে অনেক দল কোন অবস্থাতেই ধর্মনিরপেক্ষতা চায় না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের (অনেক সময় মনে হয় অন্তরীন সরকার) সুবর্ণ সুযোগ ছিল দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ ও দলনিরপেক্ষ করার, কিন্তু ব্যর্থতাই যার একমাত্র সাফল্য তার কাছে কিই বা আশা করা যেতে পারে?
বিজয়ের শুভেচ্ছা শুধু তাদের জন্য যারা দ্ব্যর্থহীন ভাবে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঙালির বিজয়কে গ্রহণ করে ও ৭১ - ২৪ প্রশ্ন না তুলে একাত্তরের বিজয় ও বাহাত্তরের সংবিধান রক্ষা করা নিজেদের দায়িত্ব মনে করে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
১৬ ডিসেম্বর ছিল বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনেই দীর্ঘ ২৪ বছরের সংগ্রাম সাফল্যের মুখ দেখেছিল কোটি কোটি মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। তবে ২০২৫ সালে জাতি বিজয় দিবস কতটুকু পালন করছে আর কতটুকু বিজয়ের অর্জন ধূলায় লুন্ঠিত হচ্ছে বিজিতদের হাতে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিজিতরা বরাবরই ঐক্যবদ্ধ প্রতিশোধের নেশায়, বিজয়ীরা প্রথম থেকেই দ্বিধাবিভক্ত ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। এমনকি এই বন্টনে ন্যায্য ভাগ পায়নি বলে যারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করে তাদের অনেকেই আদর্শিক শত্রুর সাথে হাত মিলিয়েছে। অবস্থা অনেকটা বৌয়ের সাথে রাগ করে সব ভাত অন্য বাড়ির কুকুরকে দিয়ে খাওয়ানোর মত আর কি! ফলাফল - ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। বিজয় আজ সুদূর অতীত। যে জাতির বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা বিজয়ের মূল্যায়ন করতে পারে না, বিজয়ের মালা সে জাতির কাছে গলার ফাঁস। সব দেখে মনে হয় দেশের রাজনীতিবিদরা এখন এই ফাঁস খুলে বদ্ধপরিকর। আর তাই তো মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্মৃতি একের পর এক ধ্বংস করা হচ্ছে আর যারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের শরীক বলে মনে করে তারাও বিভিন্ন অজুহাতে সেটা সমর্থন করে যাচ্ছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে কেমন ছিল ২০২৫ এর বিজয় দিবস? রাশিয়ায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাদের বিজয় সম্পর্কে বলা হয় চোখের জলে ভেজা বিজয়, সে অশ্রু একদিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া দেশবাসীর জন্য কষ্টের অশ্রু, অন্যদিকে তা একই সাথে যুদ্ধ শেষ হবার আনন্দাশ্রু। বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার মনে হয়েছে দুঃখের বোঝাটাই ভারী, বিশেষ করে এই বিজয়কে যারা হৃদয়ে লালন করে, মননে ধারণ করে।
বিজয় দিবসের ঠিক দুই দিন আগেই ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বাঙালির ইতিহাসে মনে হয় সবচেয়ে কালো দিন। সারা বছর ধরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা বাংলাদেশকে মেধা শূন্য করেছে। কেন? কারণ বাংলার শিক্ষিত সমাজই সবার আগে পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলেছে। শিক্ষিত বাঙালিই প্রথম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছে। ছাত্র সমাজই প্রথম উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাকিস্তানের জন্ম ধর্মের ছত্রছায়ায়। সেদিক থেকেই জন্মের আগেই তার মুসলমানি হয়ে গেছিল। আর ধর্মভিত্তিক সমাজে শিক্ষাকে অনুৎসাহিত করাটা প্রত্যাশিত ছিল। কারণ শিক্ষা ধর্মের সবচেয়ে বড় শত্রু। শিক্ষা মানেই জানার আগ্রহ, শিক্ষা মানেই প্রশ্ন, শিক্ষা মানেই পুরানোকে অস্বীকার করে নতুনের সন্ধান করা। আর এ কারণেই ধর্মভিত্তিক সমাজ সবসময়ই শিক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখে। এই সন্দেহের কারণেই এক সময় ভারতের মুসলিম সমাজ পশ্চিমা বা ব্রিটিশ শিক্ষা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেছিল। আপাত দৃষ্টিতে সেটা পশ্চিমা শিক্ষা বিরোধী মনে হলেও এর মূল কারণ ছিল শিক্ষার প্রতি অবিশ্বাস। যদি ধর্মীয় শিক্ষা শুধু ধর্ম গ্রন্থ মুখস্থ করা এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে আধুনিক শিক্ষা মানে সত্যের সন্ধান করা, প্রচলিত সত্যকে প্রশ্ন করা। আর এটা সব রকম ধর্মের সাথেই সাংঘর্ষিক। তাই বাংলাদেশের বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা যে পাকিস্তানের শাসক ও ধর্মীয় দলগুলোর বিরাগভাজন হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। যত দিন পর্যন্ত তারা একাত্তরের এই যুদ্ধে নিজদের বিজয়ের সম্ভাবনা দেখত ততদিন তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করলেও সেটা করত গোপনে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চক্ষুর আড়ালে। কিন্তু যখন তারা নিশ্চিত হয় যে পরাজয় অবধারিত, তখন আর রাখঢাকের প্রয়োজন ছিল না, ছিল প্রতিশোধের দুর্বার নেশা যাতে বিজয়ী বাঙালি সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। বিগত অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস বলে এ কাজে তারা শুধু সফলই হয়নি, আশাতীত ভাবে সফল হয়েছে। যার ফলে যে ভাষাকে কেন্দ্র করে আমাদের সংগ্রামের শুরু, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমরা তাকে সেই অর্থে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এমনকি আমরা কি সত্যিই এই স্বাধীনতা চাই কিনা সেই সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারিনি।
আমার মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে আচ্ছা আমরা কেন ভাষা আন্দোলন করেছিলাম, কেন ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছিল? ভাষা কি জন্যে দরকার যদি আমরা সেই ভাষায় স্বাধীন ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারি? আমরা কি সত্যিই নিজেদের কথা মন খুলে বলতে পারি? পারলে কেন মুক্তমনা কবি, সাহিত্যিক, লেখক, ব্লগার স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে না? কেন তাদের দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে হয় নিরাপত্তার জন্য? স্বাধীনতার আগে দেশের সম্পদ পাচার মত পশ্চিম পাকিস্তানে। এখন সেটা চলে যায় ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশে। তাহলে কেন এই বিজয়? দীর্ঘ চব্বিশ বছরের সংগ্রাম ছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য, কিন্তু বাস্তবে শুধু মালিকের পরিবর্তন হয়েছে, বিদেশী লুটেরার জায়গা দখল করেছে দেশী লুটেরা। তবে লুটেরা স্বদেশী সরকার সব সময়ই ছিল, সব আমলেই ছিল। কতবার ধোঁকা খেলে মানুষ বুঝবে যে নিজেদের অধিকার নিজেদেরই আদায় করতে হবে যেমনটা সে করেছিল একাত্তরে?
লুটেরা হোক আর যাই হোক এতদিন পর্যন্ত দেশের সব সরকারই চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকতে। কষ্ট করে হলেও রাষ্ট্রের আইন মানে সংবিধান মেনে চলার চেষ্টা করেছে। আর এ জন্যেই সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলে সবার আগে সংবিধান স্থগিত করে। এই প্রথম বাংলাদেশে রাষ্ট্রদ্রোহী সরকার ক্ষমতাসীন। কারণ রাষ্ট্র মানে ভূমি বা জনগণ নয়, সবার আগে সংবিধান, রাষ্ট্রের ইতিহাস। যে সরকার উঠতে বসতে সংবিধান লঙ্ঘন করে, যে সরকার নির্লিপ্ত ভাবে দেশের ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করতে দেয় সে সরকার যে রাষ্ট্রদ্রোহী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেই বলার চেষ্টা করে বর্তমান সরকার একাত্তর নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না বা একাত্তর নিয়ে বর্তমান সরকার আগ্রহী নয়। সব সরকারের যে সব বিষয়ে একই রকম আগ্রহ থাকতে হবে তার কোন মানে নেই। তবে রাষ্ট্রের ইতিহাস রক্ষায় সব সরকার দায়বদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যাকে বাদ দিয়ে দেশ থাকে না। বর্তমান সরকার এখানে ব্যর্থ। আমি তো বলব তার নির্লিপ্ততা, তার নিষ্ক্রিয়তা দেশের সেই ইতিহাস মুছে দেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই আগ্রহ নেই বলাটা আসলে তাদের বয়ানকে জাস্টিফাই করা যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাওয়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে না। সাধারণ মানুষ তাদের বলে রাজাকার। আর রাজাকার মানেই পাকিস্তানের দোসর। একেই বলে পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করা। পাকিস্তান দিয়ে শুরু করে লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করে আবার পাকিস্তানেই ফিরে আসা। এটাই ২০২৫ এর ডিসেম্বর যখন দেশের প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে গিয়ে পর্যন্ত সার্কাসের অবতারণা করেন। পরের বার ওখানে ক্লিনটন বা ওবামাকে দাড় করিয়ে রাখতে হবে যাতে তিনি এ ধরণের ক্যারিকেচার করার ফুসরত না পান।
রাষ্ট্র হওয়া উচিৎ শুধু ধর্মনিরপেক্ষ নয়, দলনিরপেক্ষও। কারণ সরকারি দলের কর্মীরা যখন রাষ্ট্র থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা পায় সেটার ধর্মীয় রূপ কোন ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব। বিরোধী আসনে থাকার সময় প্রতিটি দলই চায় রাষ্ট্র যেন দলনিরপেক্ষ হয় যদিও ক্ষমতায় গেলে তা ভুলে যায়। তবে অনেক দল কোন অবস্থাতেই ধর্মনিরপেক্ষতা চায় না। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের (অনেক সময় মনে হয় অন্তরীন সরকার) সুবর্ণ সুযোগ ছিল দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ ও দলনিরপেক্ষ করার, কিন্তু ব্যর্থতাই যার একমাত্র সাফল্য তার কাছে কিই বা আশা করা যেতে পারে?
বিজয়ের শুভেচ্ছা শুধু তাদের জন্য যারা দ্ব্যর্থহীন ভাবে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঙালির বিজয়কে গ্রহণ করে ও ৭১ - ২৪ প্রশ্ন না তুলে একাত্তরের বিজয় ও বাহাত্তরের সংবিধান রক্ষা করা নিজেদের দায়িত্ব মনে করে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment