বিজন ভাবনা - (২৪) মৃত্যু কি পথ দেখাবে?

কয়েক দিন আগে দীপু দাশকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে ফেলল তথাকথিত তৌহিদী জনতা। একজন লিখল “ঐ হিন্দু লোকটার মৃত্যুর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই।” যে লিখেছে সে প্রচলিত অর্থে অশিক্ষিত কেউ নয়। সে নিশ্চয়ই সামাজিক মাধ্যমে এই খবরটি জেনেছে, তাই নাম না জানার প্রশ্ন আসে না। সেক্ষেত্রে হিন্দু লোক কথাটি আসলে একটি মানসিকতার পারিচায়ক। মানে তার কাছে হিন্দুর কোন নাম ধাম নেই, সে কেবলই একটি সংখ্যা, অনেকটা একটি গরু বা ছাগল মারা গেছে এমন একটি ভাব। এটা বলছি এ কারণে যে আমাদের সমাজে এ ধরণের মানুষরাই আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ, যাদের কাছে ভিন্ন রকমের মানুষ, তা সে মতে হোক, জাতিতে হোক, ধর্মে হোক, শুধুই একটি সংখ্যা, যাদের কোন আত্মপরিচয় নেই। “ধর্মের সাথে কোন সম্পর্ক নেই” তার এই বিবৃতিটিকে ঠিক সত্য বলা যায় না যদিও সরাসরি ধর্মের সাথে এই হত্যার কোন সম্পর্ক ছিল না। জানা গেছে যে সে একজন শ্রমিক। কিছুদিন আগে তার পদন্নোতি ঘটেছে। সেখানে আরও কয়েকজন প্রার্থী ছিল। যারা প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে তারা বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। দীপু দাশের সাথে এদের একজনের অর্থের লেনদেন নিয়ে কি একটা সমস্যা ছিল। সেই অর্থে এটা একটি অর্থনৈতিক লেনদেন সংক্রান্ত ঘটনা। এক পর্যায়ে দীপু তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে বলে অভিযোগ করে সেই লোক যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। পুলিশ কোন প্রমান পায়নি যে দীপু দাশ ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে কিছু বলেছে বা লিখেছে। শুধু তাই নয়, দীপু দাশ সাধারণ বাটন ফোন ব্যবহার করে বিধায় ইচ্ছে থাকলেও লেখার সুযোগ নেই তার। তবে বর্তমান বাংলাদেশে এরপর আর কোন যুক্তি থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, ঐ লোক যদি হিন্দু বা সংখ্যালঘু না হত, তাহলে কি কেউ এই অভিযোগ করতে পারত বা করত? আর করলেই কি এভাবে তৌহিদী জনতা মুহূর্তের মধ্যে জড়ো হয়ে তাকে হত্যা করত? জিয়াউল হকের শাসনামলে পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইন চালু হবার পর থেকে কত লোক যে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে সে দেশে। কারও বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ করলেই হল, কোন রকম স্বাক্ষ্য প্রমান বা বিচার ছাড়াই তৌহিদী জনতা তাকে আল্লাহ্‌র দুনিয়া থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। তা সে পাকিস্তানে হোক, আফগানিস্তানে হোক আর বাংলাদেশেই হোক। এর কারণ একটাই - দেশে আইনের অসম প্রয়োগ। এক দল লোক এমনকি কোন অপরাধ করার আগেই আইনের চোখে দোষী শুধু সঠিক পরিবারে জন্ম নেয়নি বা সঠিক নাম ধারণ করে না বলে। ধরে নিলাম যে ধর্মের অবমাননা করা আইনের চোখে অপরাধ। কিন্তু নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে মানুষের ঘরবাড়ি পোড়ানো বা মানুষ হত্যা করা তো অনেক বড় অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশে কি এসব অপরাধের কোন বিচার কখনও হয়েছে? হয়নি বলেই তো বারবার সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন রকমের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, হচ্ছে। এসব আক্রমণের লক্ষ্য সব সময়ই একটা – সংখ্যালঘুদের জমিজমা বাড়িঘর দখল করা। কিন্তু এসব অপরাধ করতে বারবার ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই যারা এসব ঘটনার সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই বলে স্ট্যাটাস দেয়, তারা আসলে তাদের ধর্মকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়। সত্যিকার ধার্মিক হলে, ধর্মের ধ্বজা সমুন্নত রাখতে চাইলে তারা বরং যারা ধর্মের নামে মানুষ খুন করে, মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হত। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে কেউ মহৎ হতে পারে না।

ইতিমধ্যে দেশে প্রথম আলো জ্বলেছে, ডেইলী স্টার পুড়েছে, ভাংচুর হয়েছে ছায়ানট আর উদীচীর অফিস। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের পালা চুকিয়ে তৌহিদী জনতা এবার বাকস্বাধীনতা, সংস্কৃতি এসব থেকে দেশকে মুক্ত করতে রাস্তায় নেমেছে। তবে এখন আক্রমণ শুরু হয়েছে জুলাইয়ের প্রতি যারা কমবেশি লয়াল ছিল তাদের উপর। এটা মনে হয় সবাইকে বুঝতে দেয়া যে শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা, প্রশ্নকারী – সবাই তাদের শত্রু, শুধু নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে কিছুদিন তাদের সাথে থাকার, পাশে বসার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কাজ শেষ, কল্লা ফতে। এত দিন যেসব মানুষ নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে দাবী করে এসেছে, স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে এসেছে এবং একই সাথে নিজেদের জুলাই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত, সেই আন্দোলনের পরিকল্পকদের একজন বলে দাবি করে তাদের ভাবার সময় এসেছে তারা ঠিক কি চায়?

এক সময় মনে হত সংস্কৃতের সাথে নামের মিল থাকায় এরা সংস্কৃতির প্রতি খড়গহস্ত। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। যখন কেউ দেশের খোলনলচে বদলে ফেলতে চায় সেটা তারা শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সেটা ঘটেছে, ঘটেছে অন্যান্য বিভিন্ন দেশে। সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের পর লেনিন সেরগেই প্রকফেয়েভ, সেরগেই রাখমানিনভ, ভ্লাদিমির নাবোকভ, মারিনা ৎসভেতায়েভা, ইভান বুনিন, ফিওদর শালিয়াপিন সহ ভিন্ন মতাবলম্বী ৮১ জন (মতান্তরে দুই শতাধিক) বুদ্ধিজীবীকে দেশত্যাগে বাধ্য করেন। আসলে বিপ্লবের পরপরই অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। ১৯২২ সালে লেনিন এদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে নির্বাসনে পাঠান। তাঁদের পাঁচটি জাহাজে করে পেত্রোগ্রাদ (পরে লেনিনগ্রাদ আর অধুনা সাঙ্কত পিতেরবুরগ) থেকে জার্মানি পাঠানো হয়। নির্বাসিত এই বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অনেক দার্শনিক ছিলেন বিধায় এই ঘটনা ইতিহাসে দার্শনিক জাহাজ নামে খ্যাত। বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদীরা যে মৃত্যুদণ্ডকেই বেছে নেয় যার প্রমাণ একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর ও পরবর্তীতে মুক্তমনা বুদ্ধিজীবী ও ব্লগার হত্যা। যদি লেনিনের সাথে ভিন্ন মতাবলম্বী বুদ্ধিজীবীদের ছিল আদর্শিক বিরোধ, মৌলবাদীরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করছে, মানবিকতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, বাঙালির অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই এখনও যারা ভাবে নিজেদের জুলাই বিপ্লবী বলে ঘোষণা করলেই মৌলবাদের কালো হাত তাদের ঘাড় মটকাবে না, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে।

একটা সময় জর্জ বুশের সেই কথাটি “হয় তুমি আমাদের সাথে, নয়তো তুমি আমাদের শত্রু” এই কথাটি খুব অপছন্দ করতাম। এখনও যে পছন্দ করি তা নয়। কারণ জীবন সাদা কালো নয়। এমনকি সাদা কালোর মধ্যেও অসংখ্য হাফটোন আছে। তাছাড়া সব বিষয়ে যে একমত হতেই হবে তার কোন মানে নেই। তবে বর্তমান যুগ প্যাকেজের যুগ। তাই তো এমনকি গণভোটের প্রশ্নও প্যাকেজ হিসেবে আসে – হয় সব নেবে না হয় সব হারাবে। তাই এই প্যাকেজের যুগে হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকতে হবে না হয় এর বিরোধী হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে চাইব আবার একই সাথে রাজাকারদের সাথে বসে দহরম মহরম করব সেটা তো হয় না। এটা আমাকে ছাত্রজীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে কোন ধরণের ব্যবসাকে কালোবাজারি মনে করা হত যা ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমাদের অনেকেই তখন জিন্সটা বা ডলারটা বিক্রি করে ভালো থাকত, আবার অনেকেই এসব এড়িয়ে চলত। তবে যারা এড়িয়ে চলত তাদের অনেকেই যারা জিন্স বা ডলার বিক্রি করত তাদের টাকায় আনন্দ ফুর্তি করতে মাইন্ড করত না। মানসিক ভাবে নিজেকে অপরাধী বোধ করলাম না আবার ভালোমন্দ খাওয়াও হল। অনেক আগে দেশ থেকে বাইরে এসেছি। সে সময় আমাদের কমরেডদের কারেন্সি বলতে ছিল একটাই জিনিস – তাদের সততা, রাজনৈতিক সততা। সেদিক থেকে এখন এদের বেশিরভাগই দেউলিয়া। শোনা যায় স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে তারা এমনকি পার্টির বিভিন্ন গণ সংগঠনে ভাঙ্গন পর্যন্ত ধরাতে দ্বিধা করেনি। অসুবিধা ছিল না, যদি না তাদের এই আত্মত্যাগ আরও নিষ্ঠুর স্বৈরাচারকে ক্ষমতাসীন করত। সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার – আমি কে? সময় এসেছে সেই উত্তরের উপর ভিত্তি করে নিজের পক্ষ ঠিক করার। একই সাথে রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না।

ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় যে যে স্লোগান দিয়েই ক্ষমতায় আসুক না কেন অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখল করা নব্য শাসকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগের চেয়েও অনেক বেশি নিষ্ঠুর হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা শুধু পুরাতন শাসকদের প্রতিই খড়গহস্ত হয় না, তাদের শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয় এককালীন সহযোগীরাও। ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লব কোনটাই ব্যতিক্রম নয়। আর যদি বর্তমানের বিভিন্ন রঙিন বিপ্লবের দিকে তাকাই, দেখব প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন ক্ষমতাসীনরা আরও নগ্ন ভাবে বিরোধীদের দমন করেছে, দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। খুব কম দেশই সেই শক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। এর মূল কারণ এসব ক্ষেত্রে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয় আপাত দৃষ্টিতে অসংগঠিত কোন শক্তি, মূলত তরুণ সমাজ, যাদের পেছনে থাকে আন্তর্জাতিক চক্র। যেহেতু এরা কোন রাজনৈতিক দল নয়, জনগণের কাছে তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই, তাই এদের পক্ষে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা অনেক সহজ। এর পেছনে শুধু জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি নয়, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের অনিশ্চয়তাও কাজ করে। তারা ধরেই নেয়, যদি যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারে তাহলে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। বেঁচে থাকার ইনস্টিংক্ট তাদের দানব বানিয়ে ছাড়ে। বিদেশী শক্তি তাদের এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য। এর সাথে যোগ হয় ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। ফলে তারা প্রথমেই শুরু করে শত্রু নিধন যজ্ঞ, তারপর ধীরে ধীরে সরায় এককালীন সহযোগীদের। সেটা আমরা বাংলাদেশেও দেখি। প্রথমে হিন্দু ও আওয়ামী লীগ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাউল, মাজার, কাদিয়ানী এসব হয়ে এখন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট, উদীচীর উপর আঘাত এসেছে, আঘাত আসছে বিএনপির উপর। সিপিবি সহ অন্যেরাও যে তাদের শিকার হবে এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। প্রতি দিন এদের শক্তি বাড়ছে আর বাংলাদেশের পক্ষের মানুষের শক্তি কমছে, মানুষ কমছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব মৌলবাদ বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মোড়লের ঐকমত্য কমিশন নয়, মাঠ পর্যায়ে স্বাধীনতার পক্ষের সব মানুষকে এক হয়ে এই অশুভ অপশক্তির হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হবে। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ একটাই আর তা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। জঙ্গিবাদের বাংলাদেশ হয় না, সেটা হয় পাকিস্তান।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (২৪): মৃত্যু কি পথ দেখাবে?  -বিজন সাহা https://share.google/lZlP3ziTnEsuuAoUH  

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট

বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন