বিজন ভাবনা - (২৭) ইরান
ইরান জ্বলছে - ভেতরে বাইরে সর্বত্র। এই আগুনের কারণ যেমন আভ্যন্তরীণ সমস্যা ঠিক তেমনি এর পেছনে যে বহির্বিশ্বের হাত নেই সেটাও হলফ করে বলা যাবে না। তবে একথা ঠিক যে ইরানের মানুষের জন্য বর্তমান ইসলামী শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন বিকল্প নেই, কিন্তু সেই মুক্তি যে নতুন কোন দুঃশাসন চাপিয়ে দেবে না সেটাই বা কে জানে। কারণ সেদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা ২০২৪ সালের বাংলাদেশের মত। আওয়ামী শাসনের শেষ দিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল বলতে কিছু ছিল না কারণ বিরোধী দলকে ধ্বংস করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিকেই ধ্বংস করে ফেলেছিল। ইরানের অবস্থা শুধু তাই নয়, তারচেয়েও শতগুণ খারাপ। সেই ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই সেখানে সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশে যেমন রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতা দখল করেছে ইরানেও যে তেমনি এই শূন্য স্থান পূরণে আরও বেশি উগ্রবাদীরা ক্ষমতায় আসবে না সেটা কি হলফ করে বলা যাবে? এটা মনে হচ্ছে এ কারণে যে বিগত প্রায় দুই যুগে যে সব দেশে এরকম বিপ্লব হয়েছে প্রায় সব দেশেই জনগণ ঠকেছে, ক্ষমতা চলে গেছে মৌলবাদী বা ফ্যাসিবাদীদের হাতে। এবং এসব হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত গণতান্ত্রিক শক্তির হাত ধরেই। এটা ঠিক ইরানে শাসকগোষ্ঠীর চেয়ে ভয়ঙ্কর কিছু খুঁজে বের করা কঠিন। আমাদেরও মনে হয়েছিল ২০২৪ এর আওয়ামী শাসনের চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না। বাস্তবতা বলছে পারে। আর সে কারণেই ইরানের পরিণতি নিয়ে ভয়।
আগে বিপ্লবের পরিবেশ তৈরি হত লেনিনের সূত্র মেনে - শোষকরা পারে না, শোষিতেরা চায় না। তখন যে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি যে ছিল না ঠিক তা নয়, তবে তারা তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হত, কারণ রাজ্য দখল তখন ছিল মামুলি ব্যাপার, শক্তি থাকলেই যেকোনো দেশ বিভিন্ন অজুহাতে বা বিনা অজুহাতে অন্য দেশ আক্রমণ করত। এখন যেহেতু রাজ্য দখল আন্তর্জাতিক ভাবে নিন্দনীয় তাই তৃতীয় পক্ষ চেষ্টা করে সফ্ট পাওয়ার ব্যবহার করে রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে। বর্তমান বিশ্বে তাই বিপ্লবী পরিবেশে বিভিন্ন পক্ষের উপস্থিতি দেখা যায়। শাসক দল যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে জনসমর্থন হারায় ও যেকোনো ভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। প্রথাগত বিরোধী দল যারা কমবেশি আগের ব্যবস্থা বজায় রেখে নিজেরা শোষক বা শাসক হতে চায়। দেশের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চায় এ ধরণের বিরোধী শক্তি। বিদেশি শক্তি যারা মাছ ধরতে চায় বিধায় প্রায়ই নিজেরা জল ঘোলা করে এনজিও, সামাজিক মাধ্যম সহ বিভিন্ন উপায়ে। আর জনগণ, যারা সব ধরণের মালিকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি চায় এবং যার বেশির ভাগ উপরে বর্ণিত কোন পক্ষের টোপ গিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই অর্থে এই লড়াইয়ে জনগণ বা জনগণের একটি অংশ সত্যিকার অর্থেই মুক্তি চায়, অন্য সবাই চায় ক্ষমতা। ক্ষমতা চায় জনগণকে শোষণ করতে, তাদের মুক্তির আশা আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখতে। বিগত দিনগুলোতে দেশে দেশে যে সমস্ত বিপ্লব হয়েছে তা সে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই হোক আর বাইরের ইন্ধনেই হোক, প্রায় সব সময় জনগণ থেকেছে রিসিভিং এন্ডে। জনগণের নামে, জনগণের হাত দিয়ে জনগণকে আরও কঠিন ভাবে শোষণ করার জন্য নতুন ব্যবস্থা এসেছে। সেটা আমরা দেখি ইউক্রেনে, দেখি বাংলাদেশে। ইউক্রেনে এলিটদের করাপশনের বিরুদ্ধে মানুষ মাঠে নেমেছিল (বা মানুষকে মাঠে নামানো গেছিল)। ফলাফল – যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, লাখ লাখ মানুষ মৃত অথবা গৃহহারা, এলিটদের সম্পদের পাহাড় ইউরোপ আমেরিকায়। এখানে যেমন ইউক্রেনের এলিটরা আছে তেমনি আছে পশ্চিমা এলিটরা। বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নয়। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে, কিন্তু যারা নেপথ্যে থেকে দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে তারা আজ কোটিপতি, বৈষম্য বিরোধী সরকার বৈষম্যের মূর্ত প্রতীক। অথচ সাধারণ মানুষ তো বটেই, কত প্রগতিশীল মানুষ, মুক্তমনা ব্লগার, লেখকরা ২০২৪ এর আন্দোলনে নিজেদের প্রোফাইল লাল করেছিল। তাই ইরানেও যে একই অবস্থা ঘটবে না সেই গ্যারান্টি দেবে কে? তাহলে উপায়?
২০২৪ সালে দেশের সেই ক্রান্তি কালে লিখেছিলাম ও বন্ধুদের সাথে আলাপচারিতায় বলেছিলাম, বিরোধী দলগুলোর উচিৎ সরকারকে চাপ দিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করতে ও কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। তাহলে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে না। সরকার ফেললে সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে জামায়েত শিবির ক্ষমতা দখল করবে। বাস্তবতা সেটাই বলে। ইরানের ক্ষেত্রেও আমার মনে হয় আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সৃষ্টি করা উচিৎ আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার। অন্তত তখন ইরানের জনগণ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাবে। প্রস্তাবটি কতটুকু বাস্তবসম্মত সে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে বিশ্ব যেভাবে একের পর এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এক সময় এরকম কোন ফরমুলা বের করতেই হবে। না হলে কোন এক দেশ অন্য দেশে গণতন্ত্র রপ্তানি করবে। রঙিন বিপ্লবীরা ক্ষমতায় আসবে কিন্তু মানুষের কোন লাভ হবে কি? রুশদেশে ডাক্তারদের একটা মন্ত্র আছে, “ক্ষতি না করা।” হ্যাঁ, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ইরানের জনগণের প্রতি শতভাগ সমর্থন থাকার পরেও একটা ভয় মনে কাজ করে, এই সমর্থন যেন ওদের আরও দুঃখের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
যেহেতু প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি, তাই বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিচিত মুখ। যদিও আমাদের সময়ে ইরানের কেউ প্যাট্রিসে পড়াশুনা করত বলে মনে হয় না, তারপরেও সেখানে কিছু পরিচিত মুখে রয়ে গেছে। ফলে ইরানের ঘটনা আমাকে ব্যক্তিগত ভাবেও নাড়া দিচ্ছে। আসলে ঝড় বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরে অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রথমেই মনে পড়ে পরিচিত মুখ। জানতে ইচ্ছে করে তাদের খবর। কেমন আছে তারা? ইরানের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মনে পড়ছে ১৯৮৬ সালের গ্রীষ্মের কথা। সেবার সাইবেরিয়া গেছিলাম ছাত্র নির্মাণ কর্মী দলে। আমাদের সাথে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির দুই ছেলে ছিল – সের্গেই নামে এক রুশ ও ইরানের এক ছেলে। মুখটা মনের আয়নায় ভাসছে, নাম মনে নেই। ওরা ছিল কবি সেরগেই ইসেনিনের ভক্ত আর সোভিয়েত বিরোধী। প্রায়ই আমাদের বিতর্ক হত বিভিন্ন প্রশ্নে। জানি না ও ইরানে ফিরে গেছিল কি না। এরপর ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মত যখন ট্রিয়েস্টে যাই ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বা আইসিটিপিতে, হাই এনার্জি সেকশনের তৎকালীন প্রধান প্রফেসর সাইফুল্লাহ রান্ডজবার-ডায়েমি আমার নাম শুনে অবাক হয়ে বলেন,
- তোমার নাম বিজন? বিজন তো ইরানে খুব জনপ্রিয় নাম।
প্রফেসর ডায়েমি ছিলেন ইরানী। আসলে ইরানেও যে বিজন নাম থাকতে পারে সেরকম কোন ধারণাই ছিল না আমার। এরপর ইরানের একছেলে আমার কাছে পিএইচডি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। সবকিছু রেডি হবার পরে পারিবারিক কারণে আর আসেনি। এরপর হাসান আমিরাচি নামে একজনের সাথে কোলাবরেশন হয়। এটা হয় আমার ভারতীয় সহকর্মীদের মাধ্যমে। কখনো দেখা হয়নি তবে এখন খুব মনে পড়ছে। অথবা সিরাজ - আমাদের ল্যাবে তিনমাসের জন্য এসেছিল। বেশ জলি। প্রায়ই গল্প গুজব হত। এছাড়া আইসিটিপিতেও বেশ কিছু ইরানি বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ হয়েছিল। এরা সবাই চেষ্টা করত ইরান থেকে বাইরে কোথাও চলে যেতে। অবশ্য শুধু ইরান কেন, সারা বিশ্ব থেকেই সবাই বাইরে যেতে চায়, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকায়। আর বিজন। হ্যাঁ, বিজন নিকুরাভান। আমাদের আলাপ ফেসবুকে। গণিতের অধ্যাপক। সেই সময় মনে হয় মালয়েশিয়ায় কাজ করতেন। পরে ইরানে ফিরে জান। একবার মস্কো এসেছিলেন, দেখা করতে চেয়েছিলেন। একদিন গ্রুপের সাথে এক্সকারশনে না গিয়ে হোটেলে অপেক্ষা করেছিলেন আমার জন্য উপহার সহ। কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় দুবনা থেকে আসতে পারিনি। আমাদের শেষ যোগাযোগ হয়েছিল ২০২১ সালের জুনে। ঐ সময়ে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। জানতে চেয়েছিলাম ওদের কথা। দুই ছেলেকে নিয়ে টেনশনে ছিলেন। এ বছরের ৫ জানুয়ারি শেষ বারের মত নেটে ছিলেন। আসলে পাছে কোন ঝামেলায় পড়েন তাই প্রথমে লিখতে চাইনি, যেমন লিখি না আলেগ নামের আমার এক ইউক্রেনের বন্ধুকে, যদি আবার ওর কোন সমস্যা হয়! এখন মনে হচ্ছে দেরি হয়ে গেল না তো?
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (২৭): ইরান -বিজন সাহা https://share.google/Hi2WC4JNFSDHGPdgX
আগে বিপ্লবের পরিবেশ তৈরি হত লেনিনের সূত্র মেনে - শোষকরা পারে না, শোষিতেরা চায় না। তখন যে তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি যে ছিল না ঠিক তা নয়, তবে তারা তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হত, কারণ রাজ্য দখল তখন ছিল মামুলি ব্যাপার, শক্তি থাকলেই যেকোনো দেশ বিভিন্ন অজুহাতে বা বিনা অজুহাতে অন্য দেশ আক্রমণ করত। এখন যেহেতু রাজ্য দখল আন্তর্জাতিক ভাবে নিন্দনীয় তাই তৃতীয় পক্ষ চেষ্টা করে সফ্ট পাওয়ার ব্যবহার করে রাষ্ট্র যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে। বর্তমান বিশ্বে তাই বিপ্লবী পরিবেশে বিভিন্ন পক্ষের উপস্থিতি দেখা যায়। শাসক দল যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অযোগ্যতার পরিচয় দিয়ে জনসমর্থন হারায় ও যেকোনো ভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। প্রথাগত বিরোধী দল যারা কমবেশি আগের ব্যবস্থা বজায় রেখে নিজেরা শোষক বা শাসক হতে চায়। দেশের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে চায় এ ধরণের বিরোধী শক্তি। বিদেশি শক্তি যারা মাছ ধরতে চায় বিধায় প্রায়ই নিজেরা জল ঘোলা করে এনজিও, সামাজিক মাধ্যম সহ বিভিন্ন উপায়ে। আর জনগণ, যারা সব ধরণের মালিকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি চায় এবং যার বেশির ভাগ উপরে বর্ণিত কোন পক্ষের টোপ গিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই অর্থে এই লড়াইয়ে জনগণ বা জনগণের একটি অংশ সত্যিকার অর্থেই মুক্তি চায়, অন্য সবাই চায় ক্ষমতা। ক্ষমতা চায় জনগণকে শোষণ করতে, তাদের মুক্তির আশা আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখতে। বিগত দিনগুলোতে দেশে দেশে যে সমস্ত বিপ্লব হয়েছে তা সে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই হোক আর বাইরের ইন্ধনেই হোক, প্রায় সব সময় জনগণ থেকেছে রিসিভিং এন্ডে। জনগণের নামে, জনগণের হাত দিয়ে জনগণকে আরও কঠিন ভাবে শোষণ করার জন্য নতুন ব্যবস্থা এসেছে। সেটা আমরা দেখি ইউক্রেনে, দেখি বাংলাদেশে। ইউক্রেনে এলিটদের করাপশনের বিরুদ্ধে মানুষ মাঠে নেমেছিল (বা মানুষকে মাঠে নামানো গেছিল)। ফলাফল – যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, লাখ লাখ মানুষ মৃত অথবা গৃহহারা, এলিটদের সম্পদের পাহাড় ইউরোপ আমেরিকায়। এখানে যেমন ইউক্রেনের এলিটরা আছে তেমনি আছে পশ্চিমা এলিটরা। বাংলাদেশ ব্যতিক্রম নয়। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে, কিন্তু যারা নেপথ্যে থেকে দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে তারা আজ কোটিপতি, বৈষম্য বিরোধী সরকার বৈষম্যের মূর্ত প্রতীক। অথচ সাধারণ মানুষ তো বটেই, কত প্রগতিশীল মানুষ, মুক্তমনা ব্লগার, লেখকরা ২০২৪ এর আন্দোলনে নিজেদের প্রোফাইল লাল করেছিল। তাই ইরানেও যে একই অবস্থা ঘটবে না সেই গ্যারান্টি দেবে কে? তাহলে উপায়?
২০২৪ সালে দেশের সেই ক্রান্তি কালে লিখেছিলাম ও বন্ধুদের সাথে আলাপচারিতায় বলেছিলাম, বিরোধী দলগুলোর উচিৎ সরকারকে চাপ দিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করতে ও কয়েক মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। তাহলে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হবে না। সরকার ফেললে সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে জামায়েত শিবির ক্ষমতা দখল করবে। বাস্তবতা সেটাই বলে। ইরানের ক্ষেত্রেও আমার মনে হয় আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সৃষ্টি করা উচিৎ আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার। অন্তত তখন ইরানের জনগণ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাবে। প্রস্তাবটি কতটুকু বাস্তবসম্মত সে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে বিশ্ব যেভাবে একের পর এক অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এক সময় এরকম কোন ফরমুলা বের করতেই হবে। না হলে কোন এক দেশ অন্য দেশে গণতন্ত্র রপ্তানি করবে। রঙিন বিপ্লবীরা ক্ষমতায় আসবে কিন্তু মানুষের কোন লাভ হবে কি? রুশদেশে ডাক্তারদের একটা মন্ত্র আছে, “ক্ষতি না করা।” হ্যাঁ, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ইরানের জনগণের প্রতি শতভাগ সমর্থন থাকার পরেও একটা ভয় মনে কাজ করে, এই সমর্থন যেন ওদের আরও দুঃখের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
যেহেতু প্যাট্রিস লুমুম্বা গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি, তাই বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পরিচিত মুখ। যদিও আমাদের সময়ে ইরানের কেউ প্যাট্রিসে পড়াশুনা করত বলে মনে হয় না, তারপরেও সেখানে কিছু পরিচিত মুখে রয়ে গেছে। ফলে ইরানের ঘটনা আমাকে ব্যক্তিগত ভাবেও নাড়া দিচ্ছে। আসলে ঝড় বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবরে অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রথমেই মনে পড়ে পরিচিত মুখ। জানতে ইচ্ছে করে তাদের খবর। কেমন আছে তারা? ইরানের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মনে পড়ছে ১৯৮৬ সালের গ্রীষ্মের কথা। সেবার সাইবেরিয়া গেছিলাম ছাত্র নির্মাণ কর্মী দলে। আমাদের সাথে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির দুই ছেলে ছিল – সের্গেই নামে এক রুশ ও ইরানের এক ছেলে। মুখটা মনের আয়নায় ভাসছে, নাম মনে নেই। ওরা ছিল কবি সেরগেই ইসেনিনের ভক্ত আর সোভিয়েত বিরোধী। প্রায়ই আমাদের বিতর্ক হত বিভিন্ন প্রশ্নে। জানি না ও ইরানে ফিরে গেছিল কি না। এরপর ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মত যখন ট্রিয়েস্টে যাই ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স বা আইসিটিপিতে, হাই এনার্জি সেকশনের তৎকালীন প্রধান প্রফেসর সাইফুল্লাহ রান্ডজবার-ডায়েমি আমার নাম শুনে অবাক হয়ে বলেন,
- তোমার নাম বিজন? বিজন তো ইরানে খুব জনপ্রিয় নাম।
প্রফেসর ডায়েমি ছিলেন ইরানী। আসলে ইরানেও যে বিজন নাম থাকতে পারে সেরকম কোন ধারণাই ছিল না আমার। এরপর ইরানের একছেলে আমার কাছে পিএইচডি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। সবকিছু রেডি হবার পরে পারিবারিক কারণে আর আসেনি। এরপর হাসান আমিরাচি নামে একজনের সাথে কোলাবরেশন হয়। এটা হয় আমার ভারতীয় সহকর্মীদের মাধ্যমে। কখনো দেখা হয়নি তবে এখন খুব মনে পড়ছে। অথবা সিরাজ - আমাদের ল্যাবে তিনমাসের জন্য এসেছিল। বেশ জলি। প্রায়ই গল্প গুজব হত। এছাড়া আইসিটিপিতেও বেশ কিছু ইরানি বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ হয়েছিল। এরা সবাই চেষ্টা করত ইরান থেকে বাইরে কোথাও চলে যেতে। অবশ্য শুধু ইরান কেন, সারা বিশ্ব থেকেই সবাই বাইরে যেতে চায়, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকায়। আর বিজন। হ্যাঁ, বিজন নিকুরাভান। আমাদের আলাপ ফেসবুকে। গণিতের অধ্যাপক। সেই সময় মনে হয় মালয়েশিয়ায় কাজ করতেন। পরে ইরানে ফিরে জান। একবার মস্কো এসেছিলেন, দেখা করতে চেয়েছিলেন। একদিন গ্রুপের সাথে এক্সকারশনে না গিয়ে হোটেলে অপেক্ষা করেছিলেন আমার জন্য উপহার সহ। কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় দুবনা থেকে আসতে পারিনি। আমাদের শেষ যোগাযোগ হয়েছিল ২০২১ সালের জুনে। ঐ সময়ে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। জানতে চেয়েছিলাম ওদের কথা। দুই ছেলেকে নিয়ে টেনশনে ছিলেন। এ বছরের ৫ জানুয়ারি শেষ বারের মত নেটে ছিলেন। আসলে পাছে কোন ঝামেলায় পড়েন তাই প্রথমে লিখতে চাইনি, যেমন লিখি না আলেগ নামের আমার এক ইউক্রেনের বন্ধুকে, যদি আবার ওর কোন সমস্যা হয়! এখন মনে হচ্ছে দেরি হয়ে গেল না তো?
বিঃ দ্রঃ লেখাটি ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (২৭): ইরান -বিজন সাহা https://share.google/Hi2WC4JNFSDHGPdgX

Comments
Post a Comment