বিজন ভাবনা - (৩৩) নির্বাচন পরবর্তী বাম রাজনীতি

নির্বাচন শেষ, এবার ফসল ঘরে তুলবার পালা। আর যাদের জমিতে ফসল ফলেনি তাদের পর্যালোচনা করার পালা কেন ফসল ফলল না। এর আগে আমরা আওয়ামী লীগকে দোষ দিয়েছি যে তখন তারা স্বাধীন ভাবে নির্বাচনী প্রচারণা করতে দেয়নি, ভোট হয়েছে আগের রাতে আর ফলে সিপিবি বা বাম জোট ভোটে অংশগ্রহণ করেও ভোট পায়নি। এবার তো প্রচার কার্যে কোন বাধা ছিল না, যতদূর জানি মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজের ভোট নিজে দিয়েছে – তাই এবার নির্বাচনে গোহারা হারার পক্ষে আগের কোন অজুহাত কাজ করবে না। এ ধরণের হার উল্টো নিজেদের গণ বিচ্ছিন্নতা বলে বিবেচিত হবে।

নির্বাচনে সিপিবির ফলাফল দেখে যারপরনাই হতাশ হয়েছি। তারা জিতবে এমনটি আশা করিনি, তবে প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে আরও ভালো করবে সেটা আশা করেছিলাম। কারণ এসব প্রার্থীদের বেশির ভাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ। রাজনৈতিক পরিচিতি, সততা, সুনাম সবই আছে। তাই ভোটের পরিমান যখন গণনার ত্রুটির সমতুল্য হয় তখন ভাবার সময় আসে নিজদের পথ ও মত নিয়ে। বলতে দ্বিধা নেই যে সবচেয়ে হতাশ করেছে সিপিবির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এদের পক্ষে পড়া ভোটের পরিমান হতাশাজনক ভাবে কম। সিপিবি একটি ঐতিহ্যবাহী দল। সাজ্জাদ জহির চন্দন ও আবদুল্লা আল ক্কাফি রতন দু'জনেই আশি ও নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। বর্তমানে তারা পার্টির মুখ। তাই তাদের এই ফলাফল এক অর্থে বাম রাজনীতির প্রতি, সিপিবির প্রতি, সিপিবির নেতৃত্বের প্রতি জনগণের অনাস্থার প্রকাশ, বলা যায় চপেটাঘাত। এই ব্যর্থতার দায় শুধু এই দুজনের নয়, সমগ্র পার্টির। গত কংগ্রেসে পার্টির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সিপিবিতে অনেক নাটক হয়েছে। শুধু সিপিবি নয়, নেতৃত্ব ঘিরে ভেঙেছে ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে এবার কি আমরা জবাবদিহিতা দেখতে পাব? আমরা সবসময় অন্যদের কাছে জবাবদিহিতা আশা করি। কবে নিজেরা ব্যর্থতার জবাব দিতে শিখব? নির্বাচনে দেশের মানুষ মৌলবাদী ও একাত্তরের বিরোধী শক্তিকে না করেছে। বিগত দেড় বছরে বিএনপির এডভোকেট ফজলুর রহমান যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লড়াই করেছেন সেই তুলনায় কমিউনিস্ট পার্টির কোন নেতা তার ধারেকাছেও ছিল না। এমনকি এই প্রশ্নে মির্জা ফখরুলের ধারেকাছেও ছিল না পার্টির কেউ যদিও এখন পর্যন্ত সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার বয়। একাত্তরের চেতনা, বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি ঊর্ধ্বে তুলে ধরা তো দূরের কথা, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বেতনভুক আলী রিয়াজদের মত প্রমাণিত দেশের স্বার্থ বিরোধী লোকদের সুপ্রসন্ন দৃষ্টিতে পড়ার জন্য বরং পার্টির নেতাদের কেউ কেউ বাহাত্তরের সংবিধানকে কম্প্রোমাইজ করার অপচেষ্টা করেছে। এডভোকেট ফজলুর রহমান একাই দেখিয়ে দিয়েছেন এত কিছুর পরেও বাংলার মাটিতে একাত্তর এখনও সবচেয়ে কাটতি চেতনা যা মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে আগলে রাখতে চায়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে নির্বাচনে পার্টির এই ভরাডুবি বাহাত্তরের সংবিধান ও একাত্তর বনাম চব্বিশ প্রশ্নে পার্টির দোদুল্যমান অবস্থানের ফল নয় তো? শেখ হাসিনা যেমন হাজারটা মসজিদ গড়ে বা কওমি জননী হয়েও মুসুল্লিদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি, সিপিবিও তেমনি একাত্তর আর চব্বিশের এক অদ্ভুত মিক্সচার জনগণকে গেলাতে পারবে না। আশা করি নির্বাচনের গণ রায় থেকে শিক্ষা নিয়ে পার্টি তার রণনীতি, রণকৌশলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবে ও নেতৃবৃন্দ নিজেদের ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে।

ইতিমধ্যেই নির্বাচনে সিপিবির প্রার্থীদের তালিকা দেখেছি বিভিন্ন গ্রূপে। এতে নতুন করে অবাক হয়েছি। ২০১০ সালে মস্কোয় আমরা বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ, রাশিয়া নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলি। সেই সময় মস্কোয় ছাত্র, বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সংগঠন ছিল, কিন্তু সাধারণ ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া বাংলাদেশীদের কোন সংগঠন ছিল না। তাই এই উদ্যোগ। বেশ ভালো সাড়া পাই। কিন্তু যখন কমিটি করা হল তখন দেখা গেল যে বেশির ভাগ সদস্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। বিষয়টি এমন নয় যে ইচ্ছাকৃত ভাবে এটা করা হয়েছিল। তবে কমবেশি সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও আগ্রহীদের নিয়ে যখন কমিটি করা হল তখন চিত্রটা এমনই দাঁড়াল। আর এটাকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ আমাদের সংগঠনকে হিন্দুদের সংগঠন বলতে শুরু করল আর যেসব মুসলিম বন্ধুরা সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরও হিন্দু বলতে শুরু করল। বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানের খবর দেখি আর তাতেও একই চিত্র দেখতে পাই। দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনুপাতের তুলনায় এসব সংগঠনে তাদের উপস্থিতি অনেক বেশি। হয়তো এটাও একটি কারণ বাঙালির আবহমান সংস্কৃতিকে হিন্দু সংস্কৃতি হিসেবে অপপ্রচার করার। এবার সিপিবির প্রার্থীদের তালিকায় প্রচুর সংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কমরেডদের উপস্থিতি দেখে সেটাই মনে হল। ছোটবেলায় যখন অগ্নি যুগের বিপ্লবী কমরেডদের নাম শুনতাম তখনও সেখানে হিন্দুদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল ও তাদের অনেকেই ছদ্ম নাম হিসেবে মুসলিম নাম ব্যবহার করতেন। আশির দশকে বিশেষ করে শক্তিশালী কৃষক ও ক্ষেতমজুর আন্দোলনের কারণে চিত্র বদলালেও মধ্যবিত্তদের মধ্যে চিত্রটি আগের মতই। সিপিবিকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মধ্যে এর বিকাশ ঘটাতে হবে আর সেটা করতে হবে মধ্যবিত্তদের মধ্যেও। তাহলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে সেটাও দূর হবে। মনে রাখতে হবে যে মৌলবাদকে রুখে দাঁড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হল সংস্কৃতি।

গত সপ্তাহে যখন নির্বাচন নিয়ে লিখলাম তখন কেউ কেউ লিখল তাদের অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভোট কেন্দ্রে গেছে, কাউকে কাউকে জোর করে নিয়ে যেতে হয়েছে। কারণ ব্যালটে তাদের পছন্দের কেউ বা কোন দল ছিল না। যাদের কথা বলছি তারা রাজনীতি সচেতন নাগরিক, দীর্ঘ দিন যাবত প্রগতিশীল (!) রাজনীতির সাথে জড়িত। এসব শুনে আমার নিজের এক অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল। আমি দুবনায় দুটো ফটো ক্লাবে যাই। ফোকাস ও অব্রাজ। ফোকাস যারা সৃষ্টি করে আমি তাদের একজন। এখানে আমরা ছবি বাছাইয়ে এক ধরণের এলিট ভাব ধরে রাখি, মানে মানের দিক থেকে কোন কমপ্রমাইজ করি না। পরে আমি অব্রাজে যেতে শুরু করি তখন প্রথম প্রথম ফোকাসের কিছু নিয়ম কানুন সেখানে আনার চেষ্টা করি। সেটা ছিল মুলত প্রদর্শনীর জন্য ছবি বাছাই করার ক্ষেত্রে। একবার আমি বললাম, “এক্ষেত্রে আমাদের একটু কড়া হতে হবে। ভাল ছবি বা থাকলে কাউকে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে হবে।” শুনে স্লাভা বলল, “দেখ, সেভাবে করলে দুই তিন জনের ছবি দিয়েই প্রদর্শনী করতে হবে। তাছাড়া যাদের ছবি বাছাই করা হবে তার মধ্যেও বেস্ট অফ দ্য বেস্ট থাকবে। তাহলে কি আমরা একটি মাত্র ছবির প্রদর্শনী করব? আমাদের লক্ষ্য তো মানুষকে ছবি তুলতে আগ্রহী করে তোলা। যদি আমরা এখন তাকে সুযোগ না দিই তাহলে সে হয়ত আর আসবেই না। ছবি তোলা আমাদের কারও পেশা নয়, সবাই আসে শখ থেকে।” কথাটি ঠিক। যদি আমরা জনগণকে গণতন্ত্রের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে চাই তাহলে যেটুকু গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার সুযোগ তাদের সামনে আসে সেটা করতে দিতে হবে আর চেষ্টা করতে হবে সে যেন তার অধিকার সঠিক ভাবে ব্যবহার করে। আমরা নিজেরাই যদি ভোট বয়কট করি বা ভোট দিতে না যাই, সেটা ত জনগণকে কোন ভালো বার্তা দেয় না। এছাড়া যদি ভালো প্রার্থী না থাকে তাহলে খারাপ প্রার্থী যেন না যেতে সেটা নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। ভালো ওষুধ না থাকলে আমরা তো বিনা বাধায় খারাপ ওষুধ বাজারে আসতে দিতে পারি না। তাহলে কেন নিজেরা নিষ্ক্রিয় হয়ে নষ্টদের হাতে সব ছেড়ে দেব?

যদি ভুল না করি এবারের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও পার্লামেন্টে অন্য যে জোট থাকছে তারা জামায়াতের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা বিরোধী গ্রুপ যারা একাত্তরকে মুছে দিতে চায়, এবং গত দেড় বছরের শাসনতন্ত্রের ধারাকে সামনে নিয়ে যেতে চায়। এক্ষেত্রে এই শক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য বিএনপির স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির সমর্থন একান্তই প্রয়োজন। পার্লামেন্টে দিতে না পারলেও জুলাই সনদ, সংবিধান সংশোধন, বিগত দেড় বছরে করা বিভিন্ন চুক্তি – এসব বিষয়ে যদি বিএনপি বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে সিপিবি সহ বাম দলগুলোর উচিৎ রাস্তায় নেমে বিএনপিকে সমর্থন দেয়া। আর আওয়ামী স্বৈরাচারের ভাঙ্গা রেকর্ড না বাজিয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগকে জাতীয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায় সে ব্যাপারেও তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এখন আর মান অভিমানের সময় নেই, দেশকে একাত্তরের ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনাই এখন একমাত্র এজেন্ডা।

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে না হলেও নব্বইয়ের দশক থেকেই শুনে আসছি বাম প্রগতিশীল তৃতীয় শক্তির কথা যা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি জনগণের সামনে একটি রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। আমাদের দেশে অনেকের মধ্যে পরিবারতন্ত্র সম্পর্কে এলার্জি থাকলেও ঘুরে ফিরে সবাই সেখানেই চলে যাই। জাতীয় পর্যায়ে তো বটেই এমনকি গ্রামের মোড়ল থেকে শুরু করে ইউনিয়নের মেম্বার, চেয়ারম্যান এসব পদেও অনেকেই পারিবারিক সূত্রে নির্বাচিত হয়। তারপরেও জাতীয় রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের প্রতি এক ধরণের অবিশ্বাস থেকেই যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ মালেক ও মিজান গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। হয়তো আরোও অনেক বিভেদ ছিল। সেই সময়ে যোগ্য নেতার অভাব ছিল না। আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, জিল্লুর রহমান থেকে শুরু করে শেখ মুজিবের সাথে রাজনীতি করা বহু নেতাই ছিলেন। কিন্তু একমাত্র শেখ হাসিনার পক্ষেই তখন সম্ভব হয়েছিল সবাইকে এক পতাকার নীচে রাখতে। জিয়াউর রহমান বিএনপিতে অনেক নেতার সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন যাদের অনেকেই আগে থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে ছিলেন পরিচিত মুখ। তাঁর মৃত্যুর পর বেগম জিয়া সবাইকে বিএনপির পতাকা তলে রাখতে সক্ষম হন। এখন সেই কাজটি করছেন তারেক রহমান। বাম ঘরানায় জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত নেতাদের অভাব নেই। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু আরও কত নাম। অন্তত বাহ্যিক ভাবে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও এবং অনেক ক্ষেত্রে মতের মিল আর সবচেয়ে বড় কথা একটি শক্তিশালী বাম মোর্চা গড়ে তোলার অপরিহার্যতা সম্পর্কে সচেতন হবার পরেও এরা এক হতে পারে নাই। এর কারণ হয়তো এমন একটি ফিগারের অভাব যা মুজিব বা জিয়ার পরিবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্য সরবরাহ করতে পেরেছে কিন্তু প্রগতিশীল বাম ঘরানা এমন কাউকে খুঁজে পায়নি বা নিজেদের ইগো বিসর্জন দিয়ে কারো একক নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি। ইগোর কাছে দল, দেশ, আদর্শ সব হেরে গেছে। এমনকি পাকিস্তান আমলেও ফজলুল হক, সরোওয়ারদি, ভাষানী এদের মত নেতা থাকতেও শেখ মুজিব সামনে চলে আসতে পেরেছিলেন। মনে হয় বাম দলগুলো এসব কথা মাথায় রেখে পুরানো নেতাদের কথা না ভেবে নতুনদের মধ্যে থেকে একজন নেতা খুঁজতে পারে যাকে তারা সবাই মিলে গড়ে তুলবে।

দল ব্যক্তিগত লাভ লোকসান বা ইগো বাস্তবায়নের জায়গা নয়। দলের আগে দেশ। তাই দেশের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ আগে দেখতে হবে। আর এই স্বার্থের মূলে আছে মুক্তিযুদ্ধ ও সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান। এটা আমাদের মূল ভিত্তি। সময়ের সাথে আমরা জানালা দরজা লাগাতে পারি, তবে ভিতটা ঠিক রেখেই। আর এজন্য বন্ধু ও শত্রুর ব্যাপারে খুব সতর্ক হতে হবে। যেসব রাজনৈতিক আঁতাত দেশের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয় তা পরিত্যাগ করতে হবে। মনে হয় বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের ধৈর্য্য কমছে আর দলের নেতা বা মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী হবার সুযোগ কমছে। ফলে আদর্শিক শত্রুদের সাথে আপোষের প্রবণতা বাড়ছে। একই সাথে পাছে ঘর ভাঙে সেই ভয়ে কর্মীরা দলের ভেতরে অনেক অন্যায় আবদার মেনে নিচ্ছে। আপোষ করতে করতে আমরা একসময় এমন এক পার্টি পাব যা শুধু নামেই কমিউনিস্ট পার্টি থাকবে, কাজে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত। আমরা সবাই পার্টি মেম্বার নই, তবে অনেকেই কমিউনিস্ট আদর্শ বিশ্বাসী। কমিউনিস্ট হবার জন্য পার্টি মেম্বার হতে হয় না। আর পার্টির গ্রুপ বা ফোরামে আলোচনা খুব একটা করা যায় না। তাই বিভিন্ন ফোরামে খোলামেলা আলোচনা হওয়া ভালো। এতে পার্টি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং কিছু নন বায়াস মতামত পাবে যা আখেরে ভালো হবে। আমি অন্তত বিশ্বাস করি পার্টি নিয়ে যারা বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করে সবাই না হলেও প্রায় সবাই পার্টির ভালো চায়। আমাদের সমস্যা হল আমরা বাইরে বিপ্লব করতে চাই কিন্তু ঘর ভাঙতে ভয় পাই, নারীদের অধিকার চেয়ে আন্দোলন করি অথচ নিজের ঘরের নারীদের অধিকার দিতে দ্বিধা করি। কেন? আগে যখন সর্বহারা ছিলাম তখন শেকল ছাড়া হারানোর কিছু ছিল না, এখন মনে হয় মুক্তি ভবন হারানোর ভয়ে ভীত সবাই।

দেশের বা সমাজের মঙ্গল করার জন্য দল অপরিহার্য নয়। যা দরকার তা হল ভালো কিছু করার ইচ্ছা ও সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করার জন্য সক্রিয় হওয়া। শুধু সৎ ভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করলেও সমাজের অনেক উপকার করা যায়, অনেককে অনেক কিছু শেখানো যায়। অবশ্যই এসব কাজ কয়েকজন মিলে দল বেঁধে করলে ভালো হয়। কিন্তু কয়েকজন মিলে করা মানেই কিছু নিয়ম কানুনের মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করা। তখন দেশ বা সমাজের পাশাপাশি এই দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থও সামন চলে আসে। যদি দেশ বা সমাজের চেয়ে গোষ্ঠীর স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয় তখন এসব দল দেশের জন্য উল্টো ক্ষতিকর হয়।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (৩৩): নির্বাচন পরবর্তী বাম রাজনীতি   -বিজন সাহা https://share.google/UGdS7JBXQAjZwJStX

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট

বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন