বিজন ভাবনা - (৩৪) যুদ্ধের জয়গান
রুশ দেশে একটি কথা আছে – অপ্রত্যাশিত ভাবে শীত চলে এল। হ্যাঁ, সবাই জানে শীত আসবে, এর জন্য প্রস্তুত হয়, হিটিং ব্যবস্থা চালু করে, গাড়ির চাকা বদলায়, শীতের জামা কাপড় বের করে। তারপরেও প্রথম বরফ মনে হয় সবাইকে অবাক করে দেয়। মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রেও তাই। এই যায় তো সেই যায়, তবুও শেষ পর্যন্ত যখন নিজের ও সবার কষ্টের অবসান ঘটিয়ে রুগী কাঙ্ক্ষিত স্বর্গের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়, সবাই হাহুতাশ শুরু করে, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। একই জিনিস দেখব যুদ্ধের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দীর্ঘ দিন ধরে যখন প্রস্তুতি নেয়া হয় তখন যুদ্ধ শুরু হলেই সবার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। আচ্ছা, ধরুন অনেক অর্থ খরচ করে বিয়ের আয়োজন হল, যদি শেষ মুহূর্তে বিয়ে ভেঙ্গে যায় তখন কি আপনি দুঃখ পাবেন না? এই যে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে যুদ্ধের আয়োজন করা হল, বিমানবাহী জাহাজ আনা হল, এল শত শত বিমান, হাজার হাজার সৈন্য – খরচ হল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার – এমতাবস্থায় যদি যুদ্ধ না হয়, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিমান ও মারণাস্ত্র যদি তাদের কেরদানি দেখাতে না পারে – তাহলে মানসম্মান কোথায় থাকে? যুদ্ধটা শুধু শক্তি দেখান নয়, এখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন, বলতে পারেন ল্যারেটারিতে যেসব মারণাস্ত্র তৈরি হয়েছে – যুদ্ধ এদের প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা। স্টেক খুব হাই। তাই যদি কেউ আশা করে যে শুধুমাত্র শান্তির কথা ভেবে আর ভুখা নাঙ্গা সাধারণ মানুষের কথা ভেবে যুদ্ধ বন্ধ করবে বিশ্বের হর্তাকর্তা ভাগ্যবিধাতারা তবে সেটা হবে দুরাশা।
আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করেছে বসন্তের শুরুতে। শোনা যায় ২৩ ফেব্রুয়ারি নাকি আক্রমণের প্ল্যান ছিল, কোন এক কারণে শুভ দিন পিছিয়ে গেছে। কেন এই আক্রমণ? ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী খোমেনির ইসলামী শাসন থেকে ইরানের জনগণকে মুক্ত করতে। এটা ঠিক যে ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা কোন মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু তাই বলে বিনা প্ররোচনায় একটি স্বার্বভৌম দেশ আক্রমণ করা কি পৃথিবীকে আরও বেশি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? ইসরাইল ঘোষণা করেছে যে ইরান তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি বিধায় সে ইরান আক্রমণ করেছে। তবে আমার কেন যেন মনে হয় ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি, যা আমেরিকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমেরিকা বলেছে তার লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। তার মানে যদি কোন দেশের সরকার তাদের পছন্দ না হয় বা কোন দেশ যদি কোন দেশকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরুপ মনে করে এবং সেই দেশ যদি যথেষ্ট শক্তিশালী না হয় তবে তাকে আক্রমণ করা ন্যায় সঙ্গত? এসব বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সামনে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেয় শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধানের জন্য। তাই ইরানের ইসলামী শাসন অপছন্দ করলেও এই ধরণের আক্রমণ সমর্থন করা মানে জঙ্গলের শাসনকে এনডোর্স করা তা সে যতই ভালো হোক না কেন। দুটো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে কম খারাপ বেছে নিতে হয়। হয়তোবা ইরানের শাসনব্যবস্থা অধিক খারাপ, কিন্তু যুদ্ধ কি অন্য পথের চেয়ে ভালো? আর দিনের শেষে মারা যাবে তো নিরীহ সাধারণ মানুষ।
আয়াতুল্লাহ খোমিনি নিহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন তার উত্তরসূরিও। নতুন আয়াতুল্লাহকে হত্যা করা হবে বলে ইসরাইল ঘোষণা দিয়েছে। আয়াতুল্লাহ একটি পদের নাম। নতুন আমিরের মত নতুন আয়াতুল্লাহ নির্বাচিত হবে। কাবুল থেকে বিতাড়িত হবার পরেও তালিবান তাদের আমীর নির্বাচন করত। তাই এখন কি নির্বাচন আর হত্যার খেলা চলতেই থাকবে? অর্ধশতাব্দী দীর্ঘ ইসলামী শাসনে কয়েক প্রজন্ম ইসলামী শাসনের সমর্থক সৃষ্টি হয়েছে ইরানে। বিরোধীরা এখনও দুর্বল। তাই এমনকি নতুন ব্যবস্থা যদি চালু হয়ও তার কলকাঠি ঘুরাবে এইসব মানুষ। ফলে শাসনব্যবস্থা নামে বদলালেও কার্যত আগের মতই থাকবে, অন্তত সমাজের গভীরে। দেশ বদলানোর জন্য যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার পুঁজিবাদী বিশ্ব সেটা কখনোই করবে না। তারা কাজ করে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে, ভিন দেশের জনস্বার্থে না। আজ সারা বিশ্ব আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি। আগে মনে হত আমেরিকা মানেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এখন দেখি দুই বছরের ইলেক্টোরাল সাইকেল - প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস নির্বাচন। এখানে সুবিধা লাভের জন্য শান্তি আর অশান্তি (যুদ্ধ) পালা করে আসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। আর এই নির্বাচনের জিম্মি হয় ভেনেজুয়েলা, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া সহ তাবৎ দুনিয়ার মানুষ।
নব্বইয়ের দশকে রাশিয়া যখন অলিগার্কদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন রাশিয়ার শাসকদের প্রতি করুণা হত। এখন দেখি আমেরিকার মত পরাক্রমশালী দেশেও একই অবস্থা। ডোনার নামে পরিচিত এসব মানুষ বিশাল অর্থের মালিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী। তারাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে অথবা সিনেটর, কংগ্রেসম্যান (ওম্যান নয় কেন?) যদিও সাধারণ মানুষ ভাবে ওরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করেছে। তবে যারা টাকা দেয় তারাই নাচায় ইউরোপ, আমেরিকার জনগণকে আর মার্কিন ও ন্যাটোর সেনাদের। রাজনৈতিক দলগুলো আর এলিট শ্রেণী সেখানে ডিজের ভূমিকা পালন করে। আচ্ছা কি স্বার্থ আছে এই সেনাদের দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোন দেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করে অথবা নিজেরা মরে? এই প্রশ্ন তারা অবশ্য নিজেরা নিজেদের করবে না। তবে তাদের হয়ে রাজনীতিবিদরা বলবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার ইত্যাদির কথা যেমন ইরানের আধ্যাত্মিক নেতারা বলে ধর্ম, ঈশ্বর ইত্যাদির কথা। জনগণ না পাবে ঈশ্বর, না পাবে গণতন্ত্র, না মানবাধিকার। অনেক সময় মনে হয় ঈশ্বর, ভগবান, গড়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এ সবই এক কাল্পনিক অলৌকিক শক্তির ভিন্ন ভিন্ন নাম যাদের ভয় বা লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে পোষ মানানো হয়।
আয়াতুল্লাহ বা ইরানের শাসন কি আমি পছন্দ করি? মেয়েদের উপর তাদের অত্যাচার? আমার বেশ কিছু ইরানী বন্ধু ও কোল্যাবরেটর আছে। তাদের অবস্থা জেনে সেই ব্যবস্থা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। তারপরেও এভাবে আয়াতুল্লাহকে খুন করা – সেটা মেনে নেয়া কষ্টকর। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের কর্মকাণ্ডের আমি বিরোধিতা করি। তাদের যথাযথ শাস্তি চাই। কিন্তু ক্রসফায়ারে তাদের মৃত্যু কামনা করি না। এটা তাদের প্রতি সহানুভূতির কারণে নয়, শাসন ব্যবস্থা রসাতলে যায় বলে। আয়াতুল্লাহর মৃত্যু তাই আয়াতুল্লাহর মৃত্যু নয়, এটা সভ্যতার মৃত্যু, বিশ্বাসের মৃত্যু। কারণ আলোচনা চালিয়ে হঠাৎ আক্রমণ - এটা বিশ্বাসঘাতকতা। আসলে ইসরাইল ও আমেরিকা যা করছে সেটা আন্তর্জাতিক মব শাসন। মব শাসনের মূল কী? বিচারহীনতা। অর্থাৎ যারা যা খুশি তাই করে তারা জানে তাদের কিছু হবে না। আমেরিকা ইসরাইল সেভাবেই চলছে। লক্ষ্য নাকি যেকোনো উপায়কে ন্যায্যতা দেয়। এই বাক্য স্তালিনের নামে চালানো হয়। তবে এই নিয়মে চললে অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে যায়। কারণ এমনকি জঙ্গলের পশুরাও কোন না কোন নিয়ম মেনে চলে। আমরা মানুষেরা যদি তা না পারি তাহলে সেটা মানুষ নামের কলঙ্ক।
ইরানের উপর আক্রমণ কোন বিছিন্ন ঘটনা নয়, একে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে আমরা ভুল করব। এটা এক দীর্ঘ সুত্রে গাঁথা বিভিন্ন ঘটনার একটি। যারাই আমেরিকার বশ্যতা মানতে অস্বীকার করেছে তাদের সবারই এই অবস্থা হয়েছে। সেটা আগেও ঘটেছে (আলিয়েন্দে, নাসের, মুজিব, সাদ্দাম, গাদ্দাফী), এখনও ঘটছে (হাসিনা, মাদুরা, আয়াতুল্লাহ)। এখানে গণতন্ত্র বা অন্য কোন বিষয় নেই, তাহলে বিশ্বের তাবৎ স্বৈর শাসকদের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের এত দহরম মহরম থাকত না। তাই যখন একটি দেশ এভাবে বিনা উস্কানিতে আক্রান্ত হয় তখন ভাবতে হয় পরবর্তী কে? সে আমার নিজের দেশ নয়তো?
ইতিহাস ও তালস্তোইয়ের “যুদ্ধ ও শান্তি” থেকে জানি নেপোলিয়ন ও রুশ সম্রাট প্রথম আলেক্সান্দর বন্ধু ছিলেন। রুশ বুদ্ধিজীবীরা তখন ফ্রেন্চ ভাষায় কথা বার্তা বলতেন। সম্রাটের স্কুল জীবনের বন্ধুদের অনেকেই নেপোলিয়নের নীতির সমর্থক ছিলেন। যতদূর জানা যায় নেপোলিয়ন প্রথমে রাশিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা করেননি। কিন্তু একের পর এক দেশ যখন প্রায় বিনা প্রতিরোধে নেপোলিয়নের বশ্যতা স্বীকার করে আর এত বড় এক সেনাবাহিনী পোষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে তখন তিনি রুশ দেশ জয়ের সিদ্ধান্ত নেন। একই কথা শোনা যায় হিটলারের ক্ষেত্রে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সাথে তার মৈত্রী চুক্তি ছিল যদিও সেই চুক্তি হয়েছিল বৃটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড এসব দেশের সাথে হিটলার শান্তি চুক্তি করার পরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেদেশের বৈমানিকদের অনেকেই রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নেয়। হিটলারও প্রায় বিনা প্রতিরোধে ইউরোপ দখল করে এবং সমস্ত ইউরোপের বলে বলীয়ান হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। কথায় বলে খাবারের সময় ক্ষুধা জাগে। কথাটা বললাম এ কারণে যে ট্রাম্পের আমেরিকা যদি খেলাচ্ছলে ভেনেজুয়েলা, ইরান এসব দখল করতে পারে তাহলে পরবর্তীতে ভারত, চীন, রাশিয়া এসব দেশে সরকার পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, বাল্টিক স্টেটগুলো যখন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। লড়াই তো হবে রাশিয়া আর আমেরিকার, যদি এই সুযোগে দুই চার টুকরা হাড্ডি বা মাংস পাওয়া যায়।
বন্ধুত্ব বলি আর শত্রুতা বলি যুগে যুগে এসব সম্পর্কের মূলে ছিল বিশ্বাস, বিশেষ করে বিভিন্ন পক্ষ যখন কোন বিষয়ে আলোচনারত থাকত। আলোচনায় দুই পক্ষ বসে একে অন্যকে বিশ্বাস করেই। আর যখন আলোচনায় অগ্রগতি ঘটে তখন ধরে নেওয়া যায় যে অন্তত সহসা কোন অঘটন ঘটবে না। কিন্তু কী ভেনেজুয়েলা, কী ইরান - দুটো ক্ষেত্রেই উল্টোটা ঘটল। আলোচনায় অগ্রগতির খবর দিয়ে আমেরিকা মাদুরাকে অপহরণ করল, হত্যা করল ইরানের নেতাদের। তাই প্রশ্ন জাগে ভারত, রাশিয়া, চীন এসব দেশ আমেরিকাকে আদৌ বিশ্বাস করতে পারে কিনা? যদি না পারে তাহলে ডিপ্লোম্যাসির কথা ভুলে যেতে হবে। ট্রাম্পের শত্রুর অভাব নেই। এবং তার বেশিরভাগ তাঁর নিজের ঘরেই। এখন যদি এদের হাতে ট্রাম্পের কিছু ঘটে সেই দায় অনায়াসে ইরান, কিউবা, ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোন অপছন্দের দেশের কাঁধে চাপিয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালানো যাবে। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা। এই ধরণের সুযোগ ডীপ স্টেট কি হাতছাড়া করবে? রুশরা বলে আসা নিজের ইচ্ছায়, যাওয়া পরের ইচ্ছায়। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই। আসে নিজের ইচ্ছায় অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও আতিথেয়তার আলিঙ্গনে জড়িয়ে পরে বছরের পর বছর থেকে যায়। রেখে যায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, হাজার হাজার প্রাণ যার বেশিরভাগ নিষ্পাপ মানুষ অথবা পরিস্থিতির শিকার। আগে মনে হত মাদক, টাকা এসব বড় নেশা। এখন দেখি রক্তের নেশা বড় নেশা।
ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দেখে মনে হয় রাশিয়া যেন ইরানের সাথে বিশ্বাসঘতকতা করছে। রাশিয়া ইরানকে কীভাবে সাহায্য করতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছে – রাশিয়া ফায়ার ব্রিগেড নয় যে সবার বাড়ির আগুন নেভাতে যাবে। ইরানের নিরাপত্তা তার নিজের ব্যাপার। রাশিয়া বিভিন্ন সময়ে তাকে এয়ার ডিফেন্স ও অন্যান্য অস্ত্র যৌথ ভাবে তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব বিভিন্ন ভাবনা থেকে অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া ইরানের সাথে রাশিয়ার যে চুক্তি আছে তাতে কোন দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সেটা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে – সে বিষয়ে কোন কথা নেই।
আসলে আমার মনে হয় যারা এখন রাশিয়াকে ইরানের হয়ে যুদ্ধ করার ডাক দেয় তারা ইতিহাস জানে না। কারণ পারস্য ও রাশিয়ার মধ্যে কয়েক শ’ বছর ধরেই সম্পর্ক বেশ জটিল। সেই পারস্যেই রাশিয়ার বিখ্যাত কূটনীতিবিদ ও লেখক আলেক্সান্দর গ্রিবায়েদভ নিহত হয়েছিলেন জনতার হাতে। আজারবাইজান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন সব সময়ই ছিল। এছাড়া কাসপিয়ান সী তো আছেই। ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরান ছিল আমেরিকান বলয়ে। আবার ইসলামি বিপ্লবের পরে সেখানে যে শাসন ব্যবস্থা চালু হয় সেটাও কখনই না সোভিয়েত ইউনিয়ন না রাশিয়া – এদের কারোই পছন্দের ছিল না। উল্টো ইরান রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত ককেশাস অঞ্চলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে সেই আশংকা ছিল। তবে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব অনেকটা জোর করেই ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সাথে চীন ও রাশিয়াকে বিয়ে দিয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে ইরান ও রাশিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এটা ততটা স্বতঃস্ফূর্ত নয় যতটা বাধ্য হয়ে করা। তবে রাশিয়া ও চীন অবশ্যই বিভিন্ন ভাবে ইরানকে সাহায্য করবে, কারণ নিজেদের সীমান্তের অদূরে একটি রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে উঠুক সেটা তাদের কাম্য নয়। পাশের বাড়িতে যদি আগুন লাগে, এমনকি সেই বাড়ির মালিক শত্রু হলেও যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রতিবেশি সেই আগুন নেভাতে যাবে – তাকে ভালবেসে নয়, নিজের ঘরে যাতে আগুন না লাগে সেই ভাবনা থেকে।
আমেরিকার ইরান আক্রমণ বিশেষ করে আয়াতুল্লাহর হত্যা রাশিয়ার সামনে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইল মাত্র চার দিনে দেড় শতাধিক শিশু হত্যা করেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এভাবে শিশু তো দূরের কথা বেসামরিক লোক হত্যার অভিযোগ করা যাবে না। অনেক আগে সিরিয়ার সমুদ্রের তীরে পড়ে থাকা এক শিশুর নিথর দেহ সারা বিশ্বে ক্ষোভের সুনামি নিয়ে এসেছিল। পরে অবশ্য দেখা গেছে এসব সাজানো নাটক। ইরানের শিশু মৃত্যু নাটক নয়। তবে সভ্য বিশ্ব নিশ্চুপ। এটাই আজকের সভ্যতা। হয়তো বা তালেবান, আইএস এদের প্রভাব। যাহোক ফিরে আসি রাশিয়ার কথায়। ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে তখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনেট মস্কো সফর করেন ও পুতিনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেন যে জেলেনস্কির উপর আক্রমণ করা হবে না। ইউক্রেন রাশিয়ায় একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে উচ্চ পদস্থ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিক হত্যা করলেও রাশিয়া ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের উপর আঘাত হানে নি যদিও সমাজে এর চাহিদা আছে। আমেরিকা ইরান আক্রমণ করেছে এই উছিলায় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে যা ইরান বারবার অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। এটাও হতে পারে তার উপর টার্গেট অ্যাটাকের অজুহাত। তাই আমেরিকার আয়াতুল্লাহ হত্যা রাশিয়ার জন্য জেলেনস্কি সহ ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সরিয়ে ফেলার পথ খুলে দিয়েছে। কথা উঠেছে – আমেরিকা যা বলে সেটা নয়, যা করে সেটা কর।
তবে আমেরিকার ইরান আক্রমণ ব্রিকসের দুর্বলতা নতুন করে প্রকাশ করেছে। ব্রিকস অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সামরিক শক্তি দিয়ে অর্থনীতি রক্ষা করতে হয়। এ জন্য দরকার সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, ন্যাটোর মত পঞ্চম ধারা। কারণ একমাত্র সামরিক জোট ভুক্ত দেশ আক্রমণ করার আগে দুই বার চিন্তা করতে হবে। তাই যদি আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রাসন থেকে অন্যান্য দেশ রক্ষা পেতে চায় তবে তাদের ঐক্যবদ্ধ হবার কোন বিকল্প নেই। ব্রিকস হতে পারে তার প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম। মনে রাখতে হবে ট্রাম্পের জন্য অন্যতম প্রধান শত্রু ব্রিকস। তাই এরা সামরিক ক্ষেত্রেও জোট তৈরি না করলে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এদের মত একা একা লড়তে হবে, একা একা ধ্বংস হতে হবে। সাধারণ মানুষকে মনে রাখতে হবে যে দেশে যখন আগুন লাগে যখন শুধু ক্ষমতাসীন লোকেরাই মরে না, বেশি করে মরে সাধারণ মানুষ, শুধু বড়লোকের প্রাসাদ পুড়ে না, পুড়ে সারা দেশ।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৬ মারচ ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
আমেরিকা ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করেছে বসন্তের শুরুতে। শোনা যায় ২৩ ফেব্রুয়ারি নাকি আক্রমণের প্ল্যান ছিল, কোন এক কারণে শুভ দিন পিছিয়ে গেছে। কেন এই আক্রমণ? ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী খোমেনির ইসলামী শাসন থেকে ইরানের জনগণকে মুক্ত করতে। এটা ঠিক যে ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা কোন মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু তাই বলে বিনা প্ররোচনায় একটি স্বার্বভৌম দেশ আক্রমণ করা কি পৃথিবীকে আরও বেশি অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে না? ইসরাইল ঘোষণা করেছে যে ইরান তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি বিধায় সে ইরান আক্রমণ করেছে। তবে আমার কেন যেন মনে হয় ইসরাইলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি, যা আমেরিকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমেরিকা বলেছে তার লক্ষ্য সরকার পরিবর্তন। তার মানে যদি কোন দেশের সরকার তাদের পছন্দ না হয় বা কোন দেশ যদি কোন দেশকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরুপ মনে করে এবং সেই দেশ যদি যথেষ্ট শক্তিশালী না হয় তবে তাকে আক্রমণ করা ন্যায় সঙ্গত? এসব বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সামনে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দেয় শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধানের জন্য। তাই ইরানের ইসলামী শাসন অপছন্দ করলেও এই ধরণের আক্রমণ সমর্থন করা মানে জঙ্গলের শাসনকে এনডোর্স করা তা সে যতই ভালো হোক না কেন। দুটো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে কম খারাপ বেছে নিতে হয়। হয়তোবা ইরানের শাসনব্যবস্থা অধিক খারাপ, কিন্তু যুদ্ধ কি অন্য পথের চেয়ে ভালো? আর দিনের শেষে মারা যাবে তো নিরীহ সাধারণ মানুষ।
আয়াতুল্লাহ খোমিনি নিহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন তার উত্তরসূরিও। নতুন আয়াতুল্লাহকে হত্যা করা হবে বলে ইসরাইল ঘোষণা দিয়েছে। আয়াতুল্লাহ একটি পদের নাম। নতুন আমিরের মত নতুন আয়াতুল্লাহ নির্বাচিত হবে। কাবুল থেকে বিতাড়িত হবার পরেও তালিবান তাদের আমীর নির্বাচন করত। তাই এখন কি নির্বাচন আর হত্যার খেলা চলতেই থাকবে? অর্ধশতাব্দী দীর্ঘ ইসলামী শাসনে কয়েক প্রজন্ম ইসলামী শাসনের সমর্থক সৃষ্টি হয়েছে ইরানে। বিরোধীরা এখনও দুর্বল। তাই এমনকি নতুন ব্যবস্থা যদি চালু হয়ও তার কলকাঠি ঘুরাবে এইসব মানুষ। ফলে শাসনব্যবস্থা নামে বদলালেও কার্যত আগের মতই থাকবে, অন্তত সমাজের গভীরে। দেশ বদলানোর জন্য যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার পুঁজিবাদী বিশ্ব সেটা কখনোই করবে না। তারা কাজ করে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে, ভিন দেশের জনস্বার্থে না। আজ সারা বিশ্ব আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে জিম্মি। আগে মনে হত আমেরিকা মানেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এখন দেখি দুই বছরের ইলেক্টোরাল সাইকেল - প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস নির্বাচন। এখানে সুবিধা লাভের জন্য শান্তি আর অশান্তি (যুদ্ধ) পালা করে আসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। আর এই নির্বাচনের জিম্মি হয় ভেনেজুয়েলা, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া সহ তাবৎ দুনিয়ার মানুষ।
নব্বইয়ের দশকে রাশিয়া যখন অলিগার্কদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন রাশিয়ার শাসকদের প্রতি করুণা হত। এখন দেখি আমেরিকার মত পরাক্রমশালী দেশেও একই অবস্থা। ডোনার নামে পরিচিত এসব মানুষ বিশাল অর্থের মালিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী। তারাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে অথবা সিনেটর, কংগ্রেসম্যান (ওম্যান নয় কেন?) যদিও সাধারণ মানুষ ভাবে ওরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করেছে। তবে যারা টাকা দেয় তারাই নাচায় ইউরোপ, আমেরিকার জনগণকে আর মার্কিন ও ন্যাটোর সেনাদের। রাজনৈতিক দলগুলো আর এলিট শ্রেণী সেখানে ডিজের ভূমিকা পালন করে। আচ্ছা কি স্বার্থ আছে এই সেনাদের দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোন দেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা করে অথবা নিজেরা মরে? এই প্রশ্ন তারা অবশ্য নিজেরা নিজেদের করবে না। তবে তাদের হয়ে রাজনীতিবিদরা বলবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার ইত্যাদির কথা যেমন ইরানের আধ্যাত্মিক নেতারা বলে ধর্ম, ঈশ্বর ইত্যাদির কথা। জনগণ না পাবে ঈশ্বর, না পাবে গণতন্ত্র, না মানবাধিকার। অনেক সময় মনে হয় ঈশ্বর, ভগবান, গড়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এ সবই এক কাল্পনিক অলৌকিক শক্তির ভিন্ন ভিন্ন নাম যাদের ভয় বা লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে পোষ মানানো হয়।
আয়াতুল্লাহ বা ইরানের শাসন কি আমি পছন্দ করি? মেয়েদের উপর তাদের অত্যাচার? আমার বেশ কিছু ইরানী বন্ধু ও কোল্যাবরেটর আছে। তাদের অবস্থা জেনে সেই ব্যবস্থা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। তারপরেও এভাবে আয়াতুল্লাহকে খুন করা – সেটা মেনে নেয়া কষ্টকর। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের কর্মকাণ্ডের আমি বিরোধিতা করি। তাদের যথাযথ শাস্তি চাই। কিন্তু ক্রসফায়ারে তাদের মৃত্যু কামনা করি না। এটা তাদের প্রতি সহানুভূতির কারণে নয়, শাসন ব্যবস্থা রসাতলে যায় বলে। আয়াতুল্লাহর মৃত্যু তাই আয়াতুল্লাহর মৃত্যু নয়, এটা সভ্যতার মৃত্যু, বিশ্বাসের মৃত্যু। কারণ আলোচনা চালিয়ে হঠাৎ আক্রমণ - এটা বিশ্বাসঘাতকতা। আসলে ইসরাইল ও আমেরিকা যা করছে সেটা আন্তর্জাতিক মব শাসন। মব শাসনের মূল কী? বিচারহীনতা। অর্থাৎ যারা যা খুশি তাই করে তারা জানে তাদের কিছু হবে না। আমেরিকা ইসরাইল সেভাবেই চলছে। লক্ষ্য নাকি যেকোনো উপায়কে ন্যায্যতা দেয়। এই বাক্য স্তালিনের নামে চালানো হয়। তবে এই নিয়মে চললে অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে যায়। কারণ এমনকি জঙ্গলের পশুরাও কোন না কোন নিয়ম মেনে চলে। আমরা মানুষেরা যদি তা না পারি তাহলে সেটা মানুষ নামের কলঙ্ক।
ইরানের উপর আক্রমণ কোন বিছিন্ন ঘটনা নয়, একে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে আমরা ভুল করব। এটা এক দীর্ঘ সুত্রে গাঁথা বিভিন্ন ঘটনার একটি। যারাই আমেরিকার বশ্যতা মানতে অস্বীকার করেছে তাদের সবারই এই অবস্থা হয়েছে। সেটা আগেও ঘটেছে (আলিয়েন্দে, নাসের, মুজিব, সাদ্দাম, গাদ্দাফী), এখনও ঘটছে (হাসিনা, মাদুরা, আয়াতুল্লাহ)। এখানে গণতন্ত্র বা অন্য কোন বিষয় নেই, তাহলে বিশ্বের তাবৎ স্বৈর শাসকদের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের এত দহরম মহরম থাকত না। তাই যখন একটি দেশ এভাবে বিনা উস্কানিতে আক্রান্ত হয় তখন ভাবতে হয় পরবর্তী কে? সে আমার নিজের দেশ নয়তো?
ইতিহাস ও তালস্তোইয়ের “যুদ্ধ ও শান্তি” থেকে জানি নেপোলিয়ন ও রুশ সম্রাট প্রথম আলেক্সান্দর বন্ধু ছিলেন। রুশ বুদ্ধিজীবীরা তখন ফ্রেন্চ ভাষায় কথা বার্তা বলতেন। সম্রাটের স্কুল জীবনের বন্ধুদের অনেকেই নেপোলিয়নের নীতির সমর্থক ছিলেন। যতদূর জানা যায় নেপোলিয়ন প্রথমে রাশিয়া আক্রমণের পরিকল্পনা করেননি। কিন্তু একের পর এক দেশ যখন প্রায় বিনা প্রতিরোধে নেপোলিয়নের বশ্যতা স্বীকার করে আর এত বড় এক সেনাবাহিনী পোষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে তখন তিনি রুশ দেশ জয়ের সিদ্ধান্ত নেন। একই কথা শোনা যায় হিটলারের ক্ষেত্রে। সোভিয়েত ইউনিয়নে সাথে তার মৈত্রী চুক্তি ছিল যদিও সেই চুক্তি হয়েছিল বৃটেন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড এসব দেশের সাথে হিটলার শান্তি চুক্তি করার পরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেদেশের বৈমানিকদের অনেকেই রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নেয়। হিটলারও প্রায় বিনা প্রতিরোধে ইউরোপ দখল করে এবং সমস্ত ইউরোপের বলে বলীয়ান হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। কথায় বলে খাবারের সময় ক্ষুধা জাগে। কথাটা বললাম এ কারণে যে ট্রাম্পের আমেরিকা যদি খেলাচ্ছলে ভেনেজুয়েলা, ইরান এসব দখল করতে পারে তাহলে পরবর্তীতে ভারত, চীন, রাশিয়া এসব দেশে সরকার পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, বাল্টিক স্টেটগুলো যখন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। লড়াই তো হবে রাশিয়া আর আমেরিকার, যদি এই সুযোগে দুই চার টুকরা হাড্ডি বা মাংস পাওয়া যায়।
বন্ধুত্ব বলি আর শত্রুতা বলি যুগে যুগে এসব সম্পর্কের মূলে ছিল বিশ্বাস, বিশেষ করে বিভিন্ন পক্ষ যখন কোন বিষয়ে আলোচনারত থাকত। আলোচনায় দুই পক্ষ বসে একে অন্যকে বিশ্বাস করেই। আর যখন আলোচনায় অগ্রগতি ঘটে তখন ধরে নেওয়া যায় যে অন্তত সহসা কোন অঘটন ঘটবে না। কিন্তু কী ভেনেজুয়েলা, কী ইরান - দুটো ক্ষেত্রেই উল্টোটা ঘটল। আলোচনায় অগ্রগতির খবর দিয়ে আমেরিকা মাদুরাকে অপহরণ করল, হত্যা করল ইরানের নেতাদের। তাই প্রশ্ন জাগে ভারত, রাশিয়া, চীন এসব দেশ আমেরিকাকে আদৌ বিশ্বাস করতে পারে কিনা? যদি না পারে তাহলে ডিপ্লোম্যাসির কথা ভুলে যেতে হবে। ট্রাম্পের শত্রুর অভাব নেই। এবং তার বেশিরভাগ তাঁর নিজের ঘরেই। এখন যদি এদের হাতে ট্রাম্পের কিছু ঘটে সেই দায় অনায়াসে ইরান, কিউবা, ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোন অপছন্দের দেশের কাঁধে চাপিয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালানো যাবে। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা। এই ধরণের সুযোগ ডীপ স্টেট কি হাতছাড়া করবে? রুশরা বলে আসা নিজের ইচ্ছায়, যাওয়া পরের ইচ্ছায়। যুদ্ধের ক্ষেত্রেও তাই। আসে নিজের ইচ্ছায় অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও আতিথেয়তার আলিঙ্গনে জড়িয়ে পরে বছরের পর বছর থেকে যায়। রেখে যায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, হাজার হাজার প্রাণ যার বেশিরভাগ নিষ্পাপ মানুষ অথবা পরিস্থিতির শিকার। আগে মনে হত মাদক, টাকা এসব বড় নেশা। এখন দেখি রক্তের নেশা বড় নেশা।
ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দেখে মনে হয় রাশিয়া যেন ইরানের সাথে বিশ্বাসঘতকতা করছে। রাশিয়া ইরানকে কীভাবে সাহায্য করতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে ভ্লাদিমির পুতিন বলেছে – রাশিয়া ফায়ার ব্রিগেড নয় যে সবার বাড়ির আগুন নেভাতে যাবে। ইরানের নিরাপত্তা তার নিজের ব্যাপার। রাশিয়া বিভিন্ন সময়ে তাকে এয়ার ডিফেন্স ও অন্যান্য অস্ত্র যৌথ ভাবে তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু ইরানের নেতৃত্ব বিভিন্ন ভাবনা থেকে অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া ইরানের সাথে রাশিয়ার যে চুক্তি আছে তাতে কোন দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশ সেটা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে – সে বিষয়ে কোন কথা নেই।
আসলে আমার মনে হয় যারা এখন রাশিয়াকে ইরানের হয়ে যুদ্ধ করার ডাক দেয় তারা ইতিহাস জানে না। কারণ পারস্য ও রাশিয়ার মধ্যে কয়েক শ’ বছর ধরেই সম্পর্ক বেশ জটিল। সেই পারস্যেই রাশিয়ার বিখ্যাত কূটনীতিবিদ ও লেখক আলেক্সান্দর গ্রিবায়েদভ নিহত হয়েছিলেন জনতার হাতে। আজারবাইজান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন সব সময়ই ছিল। এছাড়া কাসপিয়ান সী তো আছেই। ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরান ছিল আমেরিকান বলয়ে। আবার ইসলামি বিপ্লবের পরে সেখানে যে শাসন ব্যবস্থা চালু হয় সেটাও কখনই না সোভিয়েত ইউনিয়ন না রাশিয়া – এদের কারোই পছন্দের ছিল না। উল্টো ইরান রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত ককেশাস অঞ্চলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে সেই আশংকা ছিল। তবে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব অনেকটা জোর করেই ইরান ও উত্তর কোরিয়ার সাথে চীন ও রাশিয়াকে বিয়ে দিয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে ইরান ও রাশিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এটা ততটা স্বতঃস্ফূর্ত নয় যতটা বাধ্য হয়ে করা। তবে রাশিয়া ও চীন অবশ্যই বিভিন্ন ভাবে ইরানকে সাহায্য করবে, কারণ নিজেদের সীমান্তের অদূরে একটি রাষ্ট্র অস্থিতিশীল হয়ে উঠুক সেটা তাদের কাম্য নয়। পাশের বাড়িতে যদি আগুন লাগে, এমনকি সেই বাড়ির মালিক শত্রু হলেও যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রতিবেশি সেই আগুন নেভাতে যাবে – তাকে ভালবেসে নয়, নিজের ঘরে যাতে আগুন না লাগে সেই ভাবনা থেকে।
আমেরিকার ইরান আক্রমণ বিশেষ করে আয়াতুল্লাহর হত্যা রাশিয়ার সামনে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইল মাত্র চার দিনে দেড় শতাধিক শিশু হত্যা করেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে এভাবে শিশু তো দূরের কথা বেসামরিক লোক হত্যার অভিযোগ করা যাবে না। অনেক আগে সিরিয়ার সমুদ্রের তীরে পড়ে থাকা এক শিশুর নিথর দেহ সারা বিশ্বে ক্ষোভের সুনামি নিয়ে এসেছিল। পরে অবশ্য দেখা গেছে এসব সাজানো নাটক। ইরানের শিশু মৃত্যু নাটক নয়। তবে সভ্য বিশ্ব নিশ্চুপ। এটাই আজকের সভ্যতা। হয়তো বা তালেবান, আইএস এদের প্রভাব। যাহোক ফিরে আসি রাশিয়ার কথায়। ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে তখন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনেট মস্কো সফর করেন ও পুতিনের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেন যে জেলেনস্কির উপর আক্রমণ করা হবে না। ইউক্রেন রাশিয়ায় একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে উচ্চ পদস্থ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিক হত্যা করলেও রাশিয়া ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের উপর আঘাত হানে নি যদিও সমাজে এর চাহিদা আছে। আমেরিকা ইরান আক্রমণ করেছে এই উছিলায় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে যা ইরান বারবার অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। এটাও হতে পারে তার উপর টার্গেট অ্যাটাকের অজুহাত। তাই আমেরিকার আয়াতুল্লাহ হত্যা রাশিয়ার জন্য জেলেনস্কি সহ ইউক্রেনের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সরিয়ে ফেলার পথ খুলে দিয়েছে। কথা উঠেছে – আমেরিকা যা বলে সেটা নয়, যা করে সেটা কর।
তবে আমেরিকার ইরান আক্রমণ ব্রিকসের দুর্বলতা নতুন করে প্রকাশ করেছে। ব্রিকস অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সামরিক শক্তি দিয়ে অর্থনীতি রক্ষা করতে হয়। এ জন্য দরকার সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, ন্যাটোর মত পঞ্চম ধারা। কারণ একমাত্র সামরিক জোট ভুক্ত দেশ আক্রমণ করার আগে দুই বার চিন্তা করতে হবে। তাই যদি আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের আগ্রাসন থেকে অন্যান্য দেশ রক্ষা পেতে চায় তবে তাদের ঐক্যবদ্ধ হবার কোন বিকল্প নেই। ব্রিকস হতে পারে তার প্রাথমিক প্ল্যাটফর্ম। মনে রাখতে হবে ট্রাম্পের জন্য অন্যতম প্রধান শত্রু ব্রিকস। তাই এরা সামরিক ক্ষেত্রেও জোট তৈরি না করলে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এদের মত একা একা লড়তে হবে, একা একা ধ্বংস হতে হবে। সাধারণ মানুষকে মনে রাখতে হবে যে দেশে যখন আগুন লাগে যখন শুধু ক্ষমতাসীন লোকেরাই মরে না, বেশি করে মরে সাধারণ মানুষ, শুধু বড়লোকের প্রাসাদ পুড়ে না, পুড়ে সারা দেশ।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৬ মারচ ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment