বিজন ভাবনা - (৩৫) অভিমন্যু
মহাভারতে আমার প্রিয় চরিত্রের একটি অভিমন্যু। অর্জুন ও সুভদ্রার ছেলে অভিমন্যু ছোটবেলা থেকেই যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী ছিল। কিন্তু আসল পরীক্ষা আসে কুরুক্ষেত্রে যখন অর্জুন নারায়ণী সেনাদের সাথে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। সেই সময় দ্রোণাচার্য চক্রব্যূহ তৈরি করেন যেখানে প্রবেশের পথ একমাত্র অর্জুন ছাড়া কারও জানা ছিল না। যুধিষ্ঠির চিন্তাগ্রস্থ। তখন অভিমন্যু এগিয়ে এসে বলে সে যখন মাতৃগর্ভে ছিল তখন পিতা অর্জুন মাকে এই ব্যুহে প্রবেশের পথ বলেন। কিন্তু এরপর মা ঘুমিয়ে গেলে সে ব্যুহ থেকে নির্গমনের কৌশল শিখতে পারেনি। তাই ব্যুহে ঢুকতে সে পারবে, কিন্তু বেরুতে পারবে কিনা তা জানে না। ভীম সহ সবাই তাকে আশ্বাস দেয়। সেই যুদ্ধে অভিমন্যু ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, শল্য সহ সাত মহারথীকে পরাজিত করলেও শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারেনি। সাত মহারথীর যৌথ আক্রমণ ঠেকাতে না পেরে মৃত্যুবরণ করে। আমার অনেক সময় মনে হয় আমরা সবাই অভিমন্যু। কারণ জীবনে ছোট বড় শত শত বিজয় লাভের পরেও একসময় মৃত্যুর হাত ধরেই সবাইকে জীবন থেকে অবসর নিতে হয়।
অভিমন্যুর কথা মনে পড়ল পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের গতিবিধি দেখে। আর সেই সাথে মনে পড়ল রাশান রুলেটের কথা। রাশান রুলেট এমন একটি খেলা যেখান থেকে সর্বশান্ত না হয়ে বেরুনো যায় না। হারলে পরের চালে জিতে অন্তত মূলধন ফিরে পাব এই আশায় একদল সর্বস্ব হারায়। আবার জিততে শুরু করলে আরও বেশি বেশি জেতার নেশায় খেলা চলে কপর্দকহীন হওয়া না পর্যন্ত। এ যেন অভিমন্যুর চক্রব্যূহে প্রবেশ। শুধু ঢুকতেই জানে। এমনকি সপ্ত রথীকে পরাজিত করার পরেও বেরুনোর পথ পায় না। একমাত্র মৃত্যুর হাত ধরেই বেরিয়ে আসতে পারে সেই মৃত্যুপুরী থেকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ট্রাম্প ইরান নামে এক ক্যাসিনোয় ঢুকে আটকে গেছেন। আসলে ইরান নয় বেচারা আটকে গেছেন যুদ্ধ নামক এক খেলার কাছে যা রাশান রুলেটের মতই সর্বগ্রাসী। ট্রাম্প এসেছিলেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ইতিমধ্যে আটটি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব নিজেকে দিয়েছেন। আরও বেশি সফল হবার নেশায় নিজের যুদ্ধ শুরু করেছেন তা থামিয়ে সাফল্যের মালায় আরও একটি মানিক্য ঝোলানোর আশায়। ভেনেজুয়েলার নৈশভ্রমণ তাকে এতটাই আত্মবিশ্বাসী করে তোলে যে ভাবতে শুরু করেন দু’ দিনেই ইরানের পতন ঘটবে। কিন্তু মনে হয় তিনি ভুল করেছেন। ভুল করেছেন হিসেবে। ভুল করেছেন ইরানের মানুষের মনস্তত্ব বুঝতে, পড়তে। আচ্ছা, এই প্রশ্ন কি ইসরাইলের নেতাদের মনে জাগে না কেন তারা প্যালেস্টাইনকে দমন করতে পারছে না? এই যে তারা বছরের পর বছর অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে প্যালেস্টাইনীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, কখনও কখনও খাদ্য ও জল সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে প্রতিনিয়ত তারপরেও কেন এদের বশ মানাতে পারছে না? সেই মানুষকে বশে আনা যায় যে ভয় পায়। কিসের ভয়? মৃত্যুর ভয়। কিন্তু যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না, যাদের কাছে মৃত্যু জীবনের মতই গৌরবের তাদের কিভাবে পোষ মানাবে? একই ঘটনা ইরানে। অস্ত্র দিয়ে মানুষ মারা যায় কিন্তু একটি জাতির জাতিসত্তা, জাতির আত্মা হত্যা করা যায় না। অবাক লাগে ভেবে, যে ইহুদি জাতি শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে হাজার হাজার বছর টিকে আছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সেই জাতি কেন অন্যদের সেই সংগ্রাম, সেই অধিকার স্বীকার করে না, অন্যদের সেই আর্তি বুঝতে পারে না। শতাব্দী ধরে চলমান এই লড়াই একটা কথাই প্রমাণ করে – এর কোন সামরিক সামাধান নেই, আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ফরমুলা বের করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী কোন সমাধান নেই। অনেক ক্ষেত্রে শক্তি ব্যবহার আসলে দুর্বলতার লক্ষণ।
দশ বছর আগে আমাদের ইনস্টিটিউটের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ড্রোন ব্যবহার করে ছবি তোলা হয়। এরপর বন্ধুদের অনেকেই ড্রোন কেনে ছবি তোলার জন্য। উপর থেকে তোলা ছবিতে পরিচিত জায়গাগুলো একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা দেয়। আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণত ডিফেন্স সেক্টর থেকে সিভিল সেক্টরে আসে। পারমাণবিক শক্তি, রকেট, কম্পিউটার এসব এ পথেই এসেছে। একমাত্র ড্রোন মনে হয় সিভিল সেক্টর থেকে ডিফেন্স সেক্টরে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপ ও আমেরিকা ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করে। রাশিয়া ইরান থেকে ড্রোন কেনে। ধীরে ধীরে তারা নিজেরাই ড্রোন তৈরি করতে শুরু করে। কামান ট্যাঙ্ক নয় ড্রোন হয়ে ওঠে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের সামনে মিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক অসহায়। শুধু ট্যাঙ্ক কেন ইরানের ড্রোনের আক্রমণের ভয়ে আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী পর্যন্ত দূর সাগরে সরিয়ে নিতে হয়। যুদ্ধ কখনোই মানবিক ছিল না। তবে ইসরাইলের হাতে সেটা যারপরনাই অমানবিক রূপ নিয়েছে যখন নির্বিচারে বেসামরিক লোকদের হত্যা করা হচ্ছে। সেটা প্যালেস্টাইন, লেবানন, ইরান সর্বত্র। তবে তারচেয়েও যেটা ভয়ঙ্কর তা হল মরু এলাকায় জলের শোধন কেন্দ্রের উপর আক্রমণ। যদি ইরানে এসব কেন্দ্রের উপর নির্ভরতা কমবেশি ৫%, ইসরাইল সহ আরব দেশগুলোর এক্ষেত্রে নির্ভরতা প্রায় ৯০% পর্যন্ত। আর তেল শোধন কেন্দ্রে আক্রমন করে সারা বিশ্বকে জ্বালানি সংকটে ফেলেছে।
আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আরব বিশ্বে যেসব সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে ড্রোনের সামনে তা সহজ লক্ষ্যবস্তু। এই যুদ্ধ কি এটাই প্রমাণ করে না যে বিশ্বের দেশে দেশে শত শত সামরিক ঘাঁটি এখন এমনকি সন্ত্রাসী গ্রুপের ড্রোন হামলার সামনেও নিরাপদ নয়। আর ড্রোন তৈরি এখন অনেকটা শ' দেড়েক বছর আগে ঘরে বসে হাত বোমা তৈরি করার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাছাড়া আরব আমিরাতে আমাজন ও মাইক্রোসফটের ডাটা সেন্টার হামলা প্রমাণ করেছে যে আধুনিক প্রযুক্তি শুধু ব্যবহারেই নয় অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও খুব সংবেদনশীল। এখন শান্তির জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের চেয়েও অন্যদের সাথে বোঝাপড়া করা অনেক বেশি ইফেক্টিভ। আর এজন্য দরকার অন্যদের অধিকার স্বীকার করা, অন্যদের অধিকার রক্ষা করা। একমাত্র অন্যের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নিজের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
নেটে খোঁজ করলে অতি সহজেই জানা যায় এ পর্যন্ত আমেরিকা কতগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, কতগুলো দেশে সরকার পরিবর্তন করেছে। আগে এসব ওপেন সিক্রেট ছিল। কয়েক বছর আগে কয়েকটি মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জন বোল্ট বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনের কথা শুধু স্বীকার করেননি, রীতিমত গর্ব করেছেন। ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকার একটিই নীতি - হেজেমনি বজায় রাখা। হোক তা নিও লিবারেল গ্লোবালাইজেশনের ছদ্মবেশে অথবা ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক শক্তি প্রয়োগে। মানবতা, গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এসব বেহেশত, হুর-পরী ইত্যাদির পশ্চিমা বয়ান বা সেই অদৃশ্য পোশাক যা দিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্বের বর্বরতা ঢাকা। এখানে ট্রাম্প সেই বাচ্চা ছেলে যে পলিট-কারেক্টনেসের তোয়াক্কা না করে রাজা যে আসলে নগ্ন সেটা বিশ্বের দরবারে প্রকাশ করেছে।
একজন শিক্ষক তার ছাত্রদেরকে তিনি যা করেন সেটা করতে বলেন আর একসময় ছাত্রকে সেই শিক্ষার উপর ভর করে আরো এগিয়ে যেতে বলেন। সত্যিকারের শিক্ষক ছাত্রদের উন্নতির মাঝে নিজের সাফল্য খুঁজে পান। রাজনীতিবিদরা ও ধর্মীয় গুরুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা করেন অনুগামীদের তা করতে নিষেধ করেন, তাদের মন্ত্র "আমি যা বলি তা কর, যা করি তা করার দরকার নেই।" এর কারণ এরা কেউ চান না তাদের অনুসারীরা তাদের ছাড়িয়ে যাক। তারা সবসময় অনুসারীদের কাঁধে ভর করে স্বার্থ সিদ্ধি করতে চান। আমাদের বুঝতে হবে যে পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা এসব বিষয়ে আমাদের শিক্ষক হতে চাইলেও তারা দিনের শেষে রাজনীতিবিদ বা ধর্ম গুরু। আমাদের দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই, তাদের একটাই উদ্দেশ্য আর তা হল দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের কথা বলে আমাদের অনুভূতি উস্কে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। তা না হলে দীর্ঘদিন এসব দেশ শাসন করার সময় তাদের যথেষ্ট সুযোগ ছিল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার, তারা সেটা তো করেইনি বরং বিভিন্ন বিভাজন সৃষ্টি করে আজকের দিনেও নিজের শোষন শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
তার মানে কি আমাদের ইরান বা বিভিন্ন দেশের দুঃশাসন সমর্থন করতে হবে? না। তবে কোন দেশের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সেই দেশের জনগণকেই করতে হবে। বাঘ তাড়াতে কুমীর ডেকে জনগণের লাভ হয় না, শুধু কুমীরের পেট ভরে। আমার ধারণা উন্নত বিশ্ব যদি নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা না ভেবে, অর্থাৎ আশু লাভের চিন্তা না করে বিভিন্ন দেশের জনগণকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করত, একদিন এই জনতাই বিভিন্ন দেশে আধুনিক ও মানবিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করত। খেয়াল করলে দেখব সবচেয়ে বেশি দুঃশাসন সেসব দেশে যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব হয় নিজেদের তাবেদার সরকার বসিয়েছে অথবা যাদেরকে বশে আনতে না পেরে শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের হিংস্র আর জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ভারত বিভাগ, আরব বিশ্ব ও আফ্রিকায় ইচ্ছেমত বিভিন্ন দেশের সৃষ্টি – এসব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের জন্য কখনই কোন সমাধান নিয়ে আসেনি, এনেছে নতুন নতুন সমস্যা। দেশ ভাগ চিরতরে হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সমস্যা দূর করার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে সেটা বগু গুণ বেড়েছে, সাম্প্রদায়িকতা হয়েছে উপমহাদেশীয় রাজনীতির তুরুপের তাস। আমরা যদি কোন কিছু কিনতে চাই তাহলে দোকানে গিয়ে আমাদের নিজেদেরই সেটা বেছে নিতে হবে, যদি দোকানদার সেটা করে তাহলে সে আমাদের সমস্যার সমাধানের কথা ভাববে না, ভাববে কীভাবে একটু বেশি মুনাফায় নিজের পণ্য বিক্রি করা যায় সেটা। যখন গণতন্ত্রের নামে, মানবতার নামে তারা আমাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয় সেটা আসলে তাদের বেশি দরকার। মানবতা বা আমাদের দেশের উন্নতি নয় – তাদের লক্ষ্য আমাদের দেশকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা। তাই অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করা নয়, নিজেদের দেশের স্বার্থে তাদের থেকে আমরা ভালোটা নেব, কিন্তু ব্যবহার করব স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এসবের উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৩ মার্চ প্রগতির জাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
অভিমন্যুর কথা মনে পড়ল পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের গতিবিধি দেখে। আর সেই সাথে মনে পড়ল রাশান রুলেটের কথা। রাশান রুলেট এমন একটি খেলা যেখান থেকে সর্বশান্ত না হয়ে বেরুনো যায় না। হারলে পরের চালে জিতে অন্তত মূলধন ফিরে পাব এই আশায় একদল সর্বস্ব হারায়। আবার জিততে শুরু করলে আরও বেশি বেশি জেতার নেশায় খেলা চলে কপর্দকহীন হওয়া না পর্যন্ত। এ যেন অভিমন্যুর চক্রব্যূহে প্রবেশ। শুধু ঢুকতেই জানে। এমনকি সপ্ত রথীকে পরাজিত করার পরেও বেরুনোর পথ পায় না। একমাত্র মৃত্যুর হাত ধরেই বেরিয়ে আসতে পারে সেই মৃত্যুপুরী থেকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ট্রাম্প ইরান নামে এক ক্যাসিনোয় ঢুকে আটকে গেছেন। আসলে ইরান নয় বেচারা আটকে গেছেন যুদ্ধ নামক এক খেলার কাছে যা রাশান রুলেটের মতই সর্বগ্রাসী। ট্রাম্প এসেছিলেন যুদ্ধ থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ইতিমধ্যে আটটি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব নিজেকে দিয়েছেন। আরও বেশি সফল হবার নেশায় নিজের যুদ্ধ শুরু করেছেন তা থামিয়ে সাফল্যের মালায় আরও একটি মানিক্য ঝোলানোর আশায়। ভেনেজুয়েলার নৈশভ্রমণ তাকে এতটাই আত্মবিশ্বাসী করে তোলে যে ভাবতে শুরু করেন দু’ দিনেই ইরানের পতন ঘটবে। কিন্তু মনে হয় তিনি ভুল করেছেন। ভুল করেছেন হিসেবে। ভুল করেছেন ইরানের মানুষের মনস্তত্ব বুঝতে, পড়তে। আচ্ছা, এই প্রশ্ন কি ইসরাইলের নেতাদের মনে জাগে না কেন তারা প্যালেস্টাইনকে দমন করতে পারছে না? এই যে তারা বছরের পর বছর অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে প্যালেস্টাইনীদের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, কখনও কখনও খাদ্য ও জল সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে প্রতিনিয়ত তারপরেও কেন এদের বশ মানাতে পারছে না? সেই মানুষকে বশে আনা যায় যে ভয় পায়। কিসের ভয়? মৃত্যুর ভয়। কিন্তু যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না, যাদের কাছে মৃত্যু জীবনের মতই গৌরবের তাদের কিভাবে পোষ মানাবে? একই ঘটনা ইরানে। অস্ত্র দিয়ে মানুষ মারা যায় কিন্তু একটি জাতির জাতিসত্তা, জাতির আত্মা হত্যা করা যায় না। অবাক লাগে ভেবে, যে ইহুদি জাতি শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে হাজার হাজার বছর টিকে আছে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে সেই জাতি কেন অন্যদের সেই সংগ্রাম, সেই অধিকার স্বীকার করে না, অন্যদের সেই আর্তি বুঝতে পারে না। শতাব্দী ধরে চলমান এই লড়াই একটা কথাই প্রমাণ করে – এর কোন সামরিক সামাধান নেই, আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ফরমুলা বের করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী কোন সমাধান নেই। অনেক ক্ষেত্রে শক্তি ব্যবহার আসলে দুর্বলতার লক্ষণ।
দশ বছর আগে আমাদের ইনস্টিটিউটের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ড্রোন ব্যবহার করে ছবি তোলা হয়। এরপর বন্ধুদের অনেকেই ড্রোন কেনে ছবি তোলার জন্য। উপর থেকে তোলা ছবিতে পরিচিত জায়গাগুলো একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা দেয়। আধুনিক প্রযুক্তি সাধারণত ডিফেন্স সেক্টর থেকে সিভিল সেক্টরে আসে। পারমাণবিক শক্তি, রকেট, কম্পিউটার এসব এ পথেই এসেছে। একমাত্র ড্রোন মনে হয় সিভিল সেক্টর থেকে ডিফেন্স সেক্টরে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে ইউরোপ ও আমেরিকা ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করে। রাশিয়া ইরান থেকে ড্রোন কেনে। ধীরে ধীরে তারা নিজেরাই ড্রোন তৈরি করতে শুরু করে। কামান ট্যাঙ্ক নয় ড্রোন হয়ে ওঠে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র। কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের সামনে মিলিয়ন ডলারের ট্যাঙ্ক অসহায়। শুধু ট্যাঙ্ক কেন ইরানের ড্রোনের আক্রমণের ভয়ে আমেরিকার বিমানবাহী রণতরী পর্যন্ত দূর সাগরে সরিয়ে নিতে হয়। যুদ্ধ কখনোই মানবিক ছিল না। তবে ইসরাইলের হাতে সেটা যারপরনাই অমানবিক রূপ নিয়েছে যখন নির্বিচারে বেসামরিক লোকদের হত্যা করা হচ্ছে। সেটা প্যালেস্টাইন, লেবানন, ইরান সর্বত্র। তবে তারচেয়েও যেটা ভয়ঙ্কর তা হল মরু এলাকায় জলের শোধন কেন্দ্রের উপর আক্রমণ। যদি ইরানে এসব কেন্দ্রের উপর নির্ভরতা কমবেশি ৫%, ইসরাইল সহ আরব দেশগুলোর এক্ষেত্রে নির্ভরতা প্রায় ৯০% পর্যন্ত। আর তেল শোধন কেন্দ্রে আক্রমন করে সারা বিশ্বকে জ্বালানি সংকটে ফেলেছে।
আমেরিকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আরব বিশ্বে যেসব সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে ড্রোনের সামনে তা সহজ লক্ষ্যবস্তু। এই যুদ্ধ কি এটাই প্রমাণ করে না যে বিশ্বের দেশে দেশে শত শত সামরিক ঘাঁটি এখন এমনকি সন্ত্রাসী গ্রুপের ড্রোন হামলার সামনেও নিরাপদ নয়। আর ড্রোন তৈরি এখন অনেকটা শ' দেড়েক বছর আগে ঘরে বসে হাত বোমা তৈরি করার পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। তাছাড়া আরব আমিরাতে আমাজন ও মাইক্রোসফটের ডাটা সেন্টার হামলা প্রমাণ করেছে যে আধুনিক প্রযুক্তি শুধু ব্যবহারেই নয় অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও খুব সংবেদনশীল। এখন শান্তির জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের চেয়েও অন্যদের সাথে বোঝাপড়া করা অনেক বেশি ইফেক্টিভ। আর এজন্য দরকার অন্যদের অধিকার স্বীকার করা, অন্যদের অধিকার রক্ষা করা। একমাত্র অন্যের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নিজের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব।
নেটে খোঁজ করলে অতি সহজেই জানা যায় এ পর্যন্ত আমেরিকা কতগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, কতগুলো দেশে সরকার পরিবর্তন করেছে। আগে এসব ওপেন সিক্রেট ছিল। কয়েক বছর আগে কয়েকটি মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জন বোল্ট বিভিন্ন দেশের সরকার পরিবর্তনের কথা শুধু স্বীকার করেননি, রীতিমত গর্ব করেছেন। ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকার একটিই নীতি - হেজেমনি বজায় রাখা। হোক তা নিও লিবারেল গ্লোবালাইজেশনের ছদ্মবেশে অথবা ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক শক্তি প্রয়োগে। মানবতা, গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা এসব বেহেশত, হুর-পরী ইত্যাদির পশ্চিমা বয়ান বা সেই অদৃশ্য পোশাক যা দিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্বের বর্বরতা ঢাকা। এখানে ট্রাম্প সেই বাচ্চা ছেলে যে পলিট-কারেক্টনেসের তোয়াক্কা না করে রাজা যে আসলে নগ্ন সেটা বিশ্বের দরবারে প্রকাশ করেছে।
একজন শিক্ষক তার ছাত্রদেরকে তিনি যা করেন সেটা করতে বলেন আর একসময় ছাত্রকে সেই শিক্ষার উপর ভর করে আরো এগিয়ে যেতে বলেন। সত্যিকারের শিক্ষক ছাত্রদের উন্নতির মাঝে নিজের সাফল্য খুঁজে পান। রাজনীতিবিদরা ও ধর্মীয় গুরুরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা করেন অনুগামীদের তা করতে নিষেধ করেন, তাদের মন্ত্র "আমি যা বলি তা কর, যা করি তা করার দরকার নেই।" এর কারণ এরা কেউ চান না তাদের অনুসারীরা তাদের ছাড়িয়ে যাক। তারা সবসময় অনুসারীদের কাঁধে ভর করে স্বার্থ সিদ্ধি করতে চান। আমাদের বুঝতে হবে যে পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা এসব বিষয়ে আমাদের শিক্ষক হতে চাইলেও তারা দিনের শেষে রাজনীতিবিদ বা ধর্ম গুরু। আমাদের দেশের মানুষের অধিকার নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই, তাদের একটাই উদ্দেশ্য আর তা হল দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্যের কথা বলে আমাদের অনুভূতি উস্কে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। তা না হলে দীর্ঘদিন এসব দেশ শাসন করার সময় তাদের যথেষ্ট সুযোগ ছিল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার, তারা সেটা তো করেইনি বরং বিভিন্ন বিভাজন সৃষ্টি করে আজকের দিনেও নিজের শোষন শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
তার মানে কি আমাদের ইরান বা বিভিন্ন দেশের দুঃশাসন সমর্থন করতে হবে? না। তবে কোন দেশের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সেই দেশের জনগণকেই করতে হবে। বাঘ তাড়াতে কুমীর ডেকে জনগণের লাভ হয় না, শুধু কুমীরের পেট ভরে। আমার ধারণা উন্নত বিশ্ব যদি নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা না ভেবে, অর্থাৎ আশু লাভের চিন্তা না করে বিভিন্ন দেশের জনগণকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করত, একদিন এই জনতাই বিভিন্ন দেশে আধুনিক ও মানবিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করত। খেয়াল করলে দেখব সবচেয়ে বেশি দুঃশাসন সেসব দেশে যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব হয় নিজেদের তাবেদার সরকার বসিয়েছে অথবা যাদেরকে বশে আনতে না পেরে শত শত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের হিংস্র আর জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ভারত বিভাগ, আরব বিশ্ব ও আফ্রিকায় ইচ্ছেমত বিভিন্ন দেশের সৃষ্টি – এসব থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের জন্য কখনই কোন সমাধান নিয়ে আসেনি, এনেছে নতুন নতুন সমস্যা। দেশ ভাগ চিরতরে হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সমস্যা দূর করার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে সেটা বগু গুণ বেড়েছে, সাম্প্রদায়িকতা হয়েছে উপমহাদেশীয় রাজনীতির তুরুপের তাস। আমরা যদি কোন কিছু কিনতে চাই তাহলে দোকানে গিয়ে আমাদের নিজেদেরই সেটা বেছে নিতে হবে, যদি দোকানদার সেটা করে তাহলে সে আমাদের সমস্যার সমাধানের কথা ভাববে না, ভাববে কীভাবে একটু বেশি মুনাফায় নিজের পণ্য বিক্রি করা যায় সেটা। যখন গণতন্ত্রের নামে, মানবতার নামে তারা আমাদের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয় সেটা আসলে তাদের বেশি দরকার। মানবতা বা আমাদের দেশের উন্নতি নয় – তাদের লক্ষ্য আমাদের দেশকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা। তাই অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করা নয়, নিজেদের দেশের স্বার্থে তাদের থেকে আমরা ভালোটা নেব, কিন্তু ব্যবহার করব স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এসবের উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১৩ মার্চ প্রগতির জাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment