বিজন ভাবনা - (৩৬) বঙ্গবন্ধু
গত ১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। ২০২০ সালে তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী পালন করা হয় অনেক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে। আসলে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দিনটি সরকারি ভাবে পালন করা হত। এদিন দেশে ও বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দুতাবাসে শিশু দিবসের আয়োজন করা হত। তবে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পরে বঙ্গবন্ধু এই বঙ্গভূমিতে আবার ব্রাত্য। তবে এটাও ঠিক যে প্রায় সব সরকারই তাঁকে ব্রাত্য করতে চেয়েছে, কিন্তু তিনি বার বার সমহিমায় ফিরে এসেছেন।
বঙ্গবন্ধু বলি বা শেখ হাসিনা বলি বা আওয়ামী লীগ বলি - সবার ভাগ্য অনেকটা সেই সন্তানের মত যার বাবা ইহুদি আর মা অন্য ধর্মের। শুনেছি এক সময় ইহুদিরাও অন্যদের মত পিতার পরিচয়ে সন্তানের ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করত। কিন্তু চারিদিক থেকে তাড়া খেয়ে যখন তাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তখন তারা ঠিক করে যে তাদের সন্তানের পরিচয় হবে মায়ের পরিচয়ে – মানে ইহুদি মায়ের সন্তান হবে ইহুদি। পক্ষান্তরে অন্যান্য ধর্মের সন্তানের পরিচয় হয় পিতার পরিচয়ে। ফলে ইহুদি বাবার ছেলে ইহুদি পরিচয় পায় না যেমন মায়ের পরিচয়ে পায় না অন্য ধর্মের পরিচয়। এখন অবশ্য এ নিয়ে কোন সমস্যা নেই, তবে এক সময়, যখন ধর্মীয় পরিচয় সমাজে গুরুত্ব বহন করত তখন সমস্যা হত। যদি খেয়াল করি তবে দেখব বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুসলমানদের স্বীকৃতি পাবার জন্য প্রায় কোন কিছুই বাকি রাখেননি যা অনেক সময় এমনকি তাদের আদর্শের পরিপন্থী। এ রকম স্বীকৃতি অনেকেই পায় না, তারপরেও তারা দিব্যি দেশ শাসন করে, রাজনীতি করে। কিন্তু এরা দুজনেই এই স্বীকৃতি লাভের কাঙ্গাল ছিলেন। শেখ হাসিনা এমনকি কওমী জননী উপাধি পান। যেন এই স্বীকৃতি পাওয়াটাই তাদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিগ্রি অর্জন করছেন, জ্ঞান নয়। এটাই মনে হয় ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর এটা শুধু তাঁদের সমস্যা নয়, বাঙালি জাতির সমস্যা।
বুদ্ধি হবার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে পূর্ববাংলার অবিসংবাদী নেতা হিসেবে জানি। একাত্তর পূর্ববর্তী দিনগুলিতে তাঁর নামে, তাঁর ডাকেই সব আন্দোলন হত। আর তিনি কারারুদ্ধ থাকলে আন্দোলন হত তাঁকে মুক্ত করার জন্য। তাই প্রথম যখন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলায় জনপ্রিয় করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে যে তারা যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন সেটা জিন্নাহর পাকিস্তান নয়। জিন্নাহর ইচ্ছায় স্টেটস হয়ে যায় স্টেট, ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের পরিবর্তে পায় ভিন্ন এক পাকিস্তান – যেখানে শুধু মালিক বদল হয়েছিল, উপনিবেশিক শাসন আগের মতই রয়ে গেছিল। আর তাই তিনি আবার লড়াইয়ে নেমেছিলেন নতুন প্রভুদের হাত থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে। আর এটাই হয়েছে তাঁর কাল। আর যাই হোক পাকিস্তান ভাগ করে স্বাধীন হওয়া, বিশেষ করে ভারতের সাহায্যে স্বাধীনতা লাভ তাঁকে অনেকেই ক্ষমা করতে পারেনি।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িত ছিল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলমান। সেই আন্দোলনের শুরুতে সাধারণ মানুষের মতামতের তোয়াক্কা তারা করেনি। করেনি এ কারণে যে ভারত বিভাগ বা পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল ব্রিটিশ রাজের শুভ দৃষ্টি। এমন হতে পারে যে দেশ ভাগ করে এই এলাকার উপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার ব্রিটিশ পরিকল্পনার অংশ এই পাকিস্তান প্রস্তাব। সেই সময়ের মুসলিম লীগের নেতাদের হাতে জনগণ ছিল ক্ষমতা লাভের দাবার ঘুঁটি। যখনই ব্রিটিশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়োজন হয়েছে তখন তারা এই সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করেছে অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষদের সাথে দাঙ্গা বাঁধাতে, আবার যখন ভোটের প্রয়োজন হয়েছে তখন এই সাধারণ মানুষই ভোট দিয়ে এদের জয়ী করে এনেছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে কেউই আর মানুষের স্বার্থের কথা ভাবেনি। সবাই নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ নিজেও শেষ পর্যন্ত জনগণের উপর ভরসা রাখতে পারেনি। গেছে প্রতিপক্ষের সাথে চুক্তি করতে, গেছে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এমনকি সত্তরের নির্বাচনী ইস্তেহারে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ না থাকলেও একাত্তরে ইয়াহিয়া খান যখন বাংলার মানুষের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তখন সাধারণ মানুষই অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবেলা করে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে। সেই সময় শান্তি কমিটির লোকজন বেশিরভাগই কিন্তু অশিক্ষিত চাষাভুষা ছিল না, ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। আমার ধারণা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তিতে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের আনুপাতিক হার নির্ধারণ করলে দেখা যাবে যে পক্ষের শক্তিতে শিক্ষিত লোকের হার তুলনামূলক ভাবে কম ছিল। এমনকি অস্থায়ী সরকারের মধ্যেও অনেকেই পাকিস্তানের সাথে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের মধ্যে থেকেই দুই অংশের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিল। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এক বড় অংশ তাই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারেই বেশি ব্যস্ত ছিল, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার কথা না ভেবে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে ভেবেছে, ঘোলা জলে ক্ষমতার মাছ শিকার করেছে। বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে এসব জানতেন, তবে নিজ দলের মধ্যে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি পেতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের ভূত থেকে মক্তি পাওয়ার জন্য আতা তুর্কের মত চরম পন্থা অবলম্বন করা দরকার ছিল তখন তিনি ভুট্টোকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একদিকে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা করার সৌদি বাদশাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে আইওসির সদস্য হবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অনেক সময় মনে হয় তাঁর বাকশাল গঠন যতটা না সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছিল তারচেয়ে বেশি ছিল নিজের দলের স্বার্থান্বেষী নেতাদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর চেষ্টা। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পরবর্তী সরকারে দল বেঁধে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের যোগদান এই ইঙ্গিতই দেয় যে দলের নেতাদের একটি বড় অংশ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত ছিল। শুধুমাত্র বিদেশী শক্তি আর কিন্তু বিপথগামী সামরিক অফিসার দ্বারা দেশের ইতিহাস একশ আশি ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল না। মনে হয় এটা আওয়ামী লীগের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। কেননা চব্বিশের পট পরিবর্তনে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অংশগ্রহণের কথা প্রায়ই শোনা যায়। আর একাত্তরের পরে দলীয় কম্বল আর গম চোরদের স্থান দখল করে ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারী নেতারা।
দোষে গুনে মানুষ। কারো কাছে সব বিষয়ে একই রকম সাফল্য আশা করা ঠিক নয়। অনেকেই পারেন সময় মত সঠিক লোকের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজে পেছন থেকে কাজ করতে। তবে সব সময় সঠিক মানুষ পাওয়া এত সহজ নয়। সত্যিকার নেতাদের শুধু ক্ষমতার লোভ থাকে না, থাকে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি। এমনকি নেহেরু গান্ধীর ভাব শিষ্য হবার পরেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের দ্বিমত ছিল, যেমন ছিল নেহেরু আর প্যাটেলের মধ্যে। তবে দেশের বৃহৎ স্বার্থে নেহেরু ও প্যাটেল একসাথে কাজ করতে পেরেছেন, আমাদের দেশে কেন সেটা হল না তা কোন দিনই আমরা জানতে পারব না। তবে তার পরিণাম আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ করে পাকিস্তানের শাসকদের তাড়ানো যায় কিন্তু মনের গভীরে বসে থাকা পাকিস্তানের ভূত তাড়ানো যায় না।
সেন্ট এক্সুপেরি তার ছোট রাজপুত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন "যাদের তুমি বশ মানিয়েছে, তাদের কাছে তুমি দায়বদ্ধ।" তবে না বঙ্গবন্ধু, না শেখ হাসিনা না আওয়ামী লীগ – কেউই এই দায়বদ্ধতার দায় নিতে পারেননি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে ও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোকের ইন্টারভিউ শুনে বুঝেছি বঙ্গবন্ধু তাঁর বন্ধুভাবাপন্ন ঘনিষ্ঠ শত্রুদের বিষয়ে খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন এবং তারপরেও এক অন্ধবিশ্বাস পোষন করতেন যে আর যাই করুক এরা তাকে হত্যা করবে না। এক দূরদর্শী নেতার এমন অদূরদর্শিতা সত্যি অবাক করার মত। তবে বঙ্গবন্ধুর দুর্ভাগ্য এই যে তিনি শুধু জীবদ্দশায় নয় মৃত্যুর পরেও অনুসারীদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে নাকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী খোন্দকার মোস্তাক তাঁর প্রতি আনুগত্য ব্যক্ত করেছেন। আওয়ামী শাসনামলে হাজার হাজার কর্মী বুক চাপড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্যের কথা জানিয়েছে আবার এরাই হাসিনার পতনে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই রাখেনি, বঙ্গবন্ধুর নাম দেশ থেকে মুছে ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কেন? কারণ তাঁর আলোয় অন্যেরা ম্লান হয়ে যায়। কবি বলেছেন ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত। সরকার পালন করুক আর নাই করুক ১৭ মার্চ আসবে, যেমন আসে ২৫ বৈশাখ বা ১১ জ্যৈষ্ঠ। প্রায়ই পদক মানুষকে মহিমান্বিত করে, তবে কিছু কিছু মানুষ উল্টো পদককেই মহিমান্বিত করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম আর বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।
অনেকেই বলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে দলীয় করে ফেলেছেন। আমার ধারণা সেটা করেছে বাধ্য হয়ে। অন্যেরা যখন বিভিন্ন যুক্তিতে বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছে তখন একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে এরা আওয়ামী লীগে স্থান পেয়েছে। এবং রাজনৈতিক কারণে তারা সেটাকে লুফেও নিয়েছে। এই দায় কি শুধু আওয়ামী লীগের একার? নাকি এর দায় আমাদেরও আছে? আমাদের নেতারা যে আবেগ নিয়ে ইনক্লাব জিন্দাবাদ স্লোগানের পক্ষে যুক্তি দাড় করায় তার সামান্যও যদি জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু এসবের পেছনে ব্যয় করত তবে এরা আজ হাতছাড়া হত না। ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালে কারারূদ্ধ বঙ্গবন্ধু জাতিকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তিনি সেই বন্ধন হতে পারেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশ পন্থী মানুষের কাছে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, আজকে জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তিনি বিভেদের দেয়াল সরিয়ে আবার ঐক্যের প্রতীক হতে পারবেন কিনা সেটা নির্ভর করবে একান্তই আমাদের উপর।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ২০ মার্চ ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বঙ্গবন্ধু বলি বা শেখ হাসিনা বলি বা আওয়ামী লীগ বলি - সবার ভাগ্য অনেকটা সেই সন্তানের মত যার বাবা ইহুদি আর মা অন্য ধর্মের। শুনেছি এক সময় ইহুদিরাও অন্যদের মত পিতার পরিচয়ে সন্তানের ধর্মীয় পরিচয় নির্ধারণ করত। কিন্তু চারিদিক থেকে তাড়া খেয়ে যখন তাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হয়, তখন তারা ঠিক করে যে তাদের সন্তানের পরিচয় হবে মায়ের পরিচয়ে – মানে ইহুদি মায়ের সন্তান হবে ইহুদি। পক্ষান্তরে অন্যান্য ধর্মের সন্তানের পরিচয় হয় পিতার পরিচয়ে। ফলে ইহুদি বাবার ছেলে ইহুদি পরিচয় পায় না যেমন মায়ের পরিচয়ে পায় না অন্য ধর্মের পরিচয়। এখন অবশ্য এ নিয়ে কোন সমস্যা নেই, তবে এক সময়, যখন ধর্মীয় পরিচয় সমাজে গুরুত্ব বহন করত তখন সমস্যা হত। যদি খেয়াল করি তবে দেখব বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুসলমানদের স্বীকৃতি পাবার জন্য প্রায় কোন কিছুই বাকি রাখেননি যা অনেক সময় এমনকি তাদের আদর্শের পরিপন্থী। এ রকম স্বীকৃতি অনেকেই পায় না, তারপরেও তারা দিব্যি দেশ শাসন করে, রাজনীতি করে। কিন্তু এরা দুজনেই এই স্বীকৃতি লাভের কাঙ্গাল ছিলেন। শেখ হাসিনা এমনকি কওমী জননী উপাধি পান। যেন এই স্বীকৃতি পাওয়াটাই তাদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ডিগ্রি অর্জন করছেন, জ্ঞান নয়। এটাই মনে হয় ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর এটা শুধু তাঁদের সমস্যা নয়, বাঙালি জাতির সমস্যা।
বুদ্ধি হবার পর থেকেই বঙ্গবন্ধুকে পূর্ববাংলার অবিসংবাদী নেতা হিসেবে জানি। একাত্তর পূর্ববর্তী দিনগুলিতে তাঁর নামে, তাঁর ডাকেই সব আন্দোলন হত। আর তিনি কারারুদ্ধ থাকলে আন্দোলন হত তাঁকে মুক্ত করার জন্য। তাই প্রথম যখন তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলায় জনপ্রিয় করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে যে তারা যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন সেটা জিন্নাহর পাকিস্তান নয়। জিন্নাহর ইচ্ছায় স্টেটস হয়ে যায় স্টেট, ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের পরিবর্তে পায় ভিন্ন এক পাকিস্তান – যেখানে শুধু মালিক বদল হয়েছিল, উপনিবেশিক শাসন আগের মতই রয়ে গেছিল। আর তাই তিনি আবার লড়াইয়ে নেমেছিলেন নতুন প্রভুদের হাত থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে। আর এটাই হয়েছে তাঁর কাল। আর যাই হোক পাকিস্তান ভাগ করে স্বাধীন হওয়া, বিশেষ করে ভারতের সাহায্যে স্বাধীনতা লাভ তাঁকে অনেকেই ক্ষমা করতে পারেনি।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িত ছিল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলমান। সেই আন্দোলনের শুরুতে সাধারণ মানুষের মতামতের তোয়াক্কা তারা করেনি। করেনি এ কারণে যে ভারত বিভাগ বা পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে তাদের প্রধান অস্ত্র ছিল ব্রিটিশ রাজের শুভ দৃষ্টি। এমন হতে পারে যে দেশ ভাগ করে এই এলাকার উপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার ব্রিটিশ পরিকল্পনার অংশ এই পাকিস্তান প্রস্তাব। সেই সময়ের মুসলিম লীগের নেতাদের হাতে জনগণ ছিল ক্ষমতা লাভের দাবার ঘুঁটি। যখনই ব্রিটিশদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়োজন হয়েছে তখন তারা এই সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করেছে অন্য ধর্মের সাধারণ মানুষদের সাথে দাঙ্গা বাঁধাতে, আবার যখন ভোটের প্রয়োজন হয়েছে তখন এই সাধারণ মানুষই ভোট দিয়ে এদের জয়ী করে এনেছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে কেউই আর মানুষের স্বার্থের কথা ভাবেনি। সবাই নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
আওয়ামী লীগ নিজেও শেষ পর্যন্ত জনগণের উপর ভরসা রাখতে পারেনি। গেছে প্রতিপক্ষের সাথে চুক্তি করতে, গেছে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। এমনকি সত্তরের নির্বাচনী ইস্তেহারে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ না থাকলেও একাত্তরে ইয়াহিয়া খান যখন বাংলার মানুষের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তখন সাধারণ মানুষই অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবেলা করে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে। সেই সময় শান্তি কমিটির লোকজন বেশিরভাগই কিন্তু অশিক্ষিত চাষাভুষা ছিল না, ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। আমার ধারণা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তিতে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষের আনুপাতিক হার নির্ধারণ করলে দেখা যাবে যে পক্ষের শক্তিতে শিক্ষিত লোকের হার তুলনামূলক ভাবে কম ছিল। এমনকি অস্থায়ী সরকারের মধ্যেও অনেকেই পাকিস্তানের সাথে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের মধ্যে থেকেই দুই অংশের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিল। যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের এক বড় অংশ তাই যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারেই বেশি ব্যস্ত ছিল, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার কথা না ভেবে নিজেদের ভাগ্য নিয়ে ভেবেছে, ঘোলা জলে ক্ষমতার মাছ শিকার করেছে। বঙ্গবন্ধু নিঃসন্দেহে এসব জানতেন, তবে নিজ দলের মধ্যে পরিবর্তন আনার পরিবর্তে মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি পেতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। যেখানে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের ভূত থেকে মক্তি পাওয়ার জন্য আতা তুর্কের মত চরম পন্থা অবলম্বন করা দরকার ছিল তখন তিনি ভুট্টোকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। একদিকে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণা করার সৌদি বাদশাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে আইওসির সদস্য হবার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অনেক সময় মনে হয় তাঁর বাকশাল গঠন যতটা না সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছিল তারচেয়ে বেশি ছিল নিজের দলের স্বার্থান্বেষী নেতাদের হাত থেকে দেশ বাঁচানোর চেষ্টা। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পরবর্তী সরকারে দল বেঁধে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের যোগদান এই ইঙ্গিতই দেয় যে দলের নেতাদের একটি বড় অংশ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত ছিল। শুধুমাত্র বিদেশী শক্তি আর কিন্তু বিপথগামী সামরিক অফিসার দ্বারা দেশের ইতিহাস একশ আশি ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব ছিল না। মনে হয় এটা আওয়ামী লীগের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য। কেননা চব্বিশের পট পরিবর্তনে দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অংশগ্রহণের কথা প্রায়ই শোনা যায়। আর একাত্তরের পরে দলীয় কম্বল আর গম চোরদের স্থান দখল করে ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারী নেতারা।
দোষে গুনে মানুষ। কারো কাছে সব বিষয়ে একই রকম সাফল্য আশা করা ঠিক নয়। অনেকেই পারেন সময় মত সঠিক লোকের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজে পেছন থেকে কাজ করতে। তবে সব সময় সঠিক মানুষ পাওয়া এত সহজ নয়। সত্যিকার নেতাদের শুধু ক্ষমতার লোভ থাকে না, থাকে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি। এমনকি নেহেরু গান্ধীর ভাব শিষ্য হবার পরেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের দ্বিমত ছিল, যেমন ছিল নেহেরু আর প্যাটেলের মধ্যে। তবে দেশের বৃহৎ স্বার্থে নেহেরু ও প্যাটেল একসাথে কাজ করতে পেরেছেন, আমাদের দেশে কেন সেটা হল না তা কোন দিনই আমরা জানতে পারব না। তবে তার পরিণাম আমরা সবাই জানি। যুদ্ধ করে পাকিস্তানের শাসকদের তাড়ানো যায় কিন্তু মনের গভীরে বসে থাকা পাকিস্তানের ভূত তাড়ানো যায় না।
সেন্ট এক্সুপেরি তার ছোট রাজপুত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন "যাদের তুমি বশ মানিয়েছে, তাদের কাছে তুমি দায়বদ্ধ।" তবে না বঙ্গবন্ধু, না শেখ হাসিনা না আওয়ামী লীগ – কেউই এই দায়বদ্ধতার দায় নিতে পারেননি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে ও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোকের ইন্টারভিউ শুনে বুঝেছি বঙ্গবন্ধু তাঁর বন্ধুভাবাপন্ন ঘনিষ্ঠ শত্রুদের বিষয়ে খুব ভালোভাবেই অবগত ছিলেন এবং তারপরেও এক অন্ধবিশ্বাস পোষন করতেন যে আর যাই করুক এরা তাকে হত্যা করবে না। এক দূরদর্শী নেতার এমন অদূরদর্শিতা সত্যি অবাক করার মত। তবে বঙ্গবন্ধুর দুর্ভাগ্য এই যে তিনি শুধু জীবদ্দশায় নয় মৃত্যুর পরেও অনুসারীদের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হচ্ছেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে নাকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী খোন্দকার মোস্তাক তাঁর প্রতি আনুগত্য ব্যক্ত করেছেন। আওয়ামী শাসনামলে হাজার হাজার কর্মী বুক চাপড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্যের কথা জানিয়েছে আবার এরাই হাসিনার পতনে শুধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই রাখেনি, বঙ্গবন্ধুর নাম দেশ থেকে মুছে ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কেন? কারণ তাঁর আলোয় অন্যেরা ম্লান হয়ে যায়। কবি বলেছেন ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত। সরকার পালন করুক আর নাই করুক ১৭ মার্চ আসবে, যেমন আসে ২৫ বৈশাখ বা ১১ জ্যৈষ্ঠ। প্রায়ই পদক মানুষকে মহিমান্বিত করে, তবে কিছু কিছু মানুষ উল্টো পদককেই মহিমান্বিত করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম আর বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে।
অনেকেই বলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে দলীয় করে ফেলেছেন। আমার ধারণা সেটা করেছে বাধ্য হয়ে। অন্যেরা যখন বিভিন্ন যুক্তিতে বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছে তখন একমাত্র উত্তরাধিকার হিসেবে এরা আওয়ামী লীগে স্থান পেয়েছে। এবং রাজনৈতিক কারণে তারা সেটাকে লুফেও নিয়েছে। এই দায় কি শুধু আওয়ামী লীগের একার? নাকি এর দায় আমাদেরও আছে? আমাদের নেতারা যে আবেগ নিয়ে ইনক্লাব জিন্দাবাদ স্লোগানের পক্ষে যুক্তি দাড় করায় তার সামান্যও যদি জয় বাংলা, বঙ্গবন্ধু এসবের পেছনে ব্যয় করত তবে এরা আজ হাতছাড়া হত না। ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালে কারারূদ্ধ বঙ্গবন্ধু জাতিকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তিনি সেই বন্ধন হতে পারেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশ পন্থী মানুষের কাছে। স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনি ছিলেন ঐক্যের প্রতীক, আজকে জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তিনি বিভেদের দেয়াল সরিয়ে আবার ঐক্যের প্রতীক হতে পারবেন কিনা সেটা নির্ভর করবে একান্তই আমাদের উপর।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ২০ মার্চ ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment