বিজন ভাবনা - (৩৮) কাউয়া

বিগত প্রায় দুই বছর ধরে চব্বিশ আর একাত্তরের দ্বন্দ্ব থামছেই না। এটা নতুন করে জ্বলে উঠেছে উদীচীর একাংশের ইয়াহিয়ারূপী হাসিনার প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের পরে। এটা শুধু ইয়াহিয়া আর হাসিনাকে এক করা নয়, দুটো ঘটনাকে এক করে দেখার প্রয়াস। অন্তত স্বার্থান্বেষী মহল এ ঘটনাকে তাদের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে যেমন এর আগে বামদের আওয়ামী সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন তারা নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে ফসল ঘরে তুলেছে। কোন ঘটনার মূল্যায়ন করতে হলে তার গুণগত ও পরিমাণগত দুটো দিকই বিবেচনায় নেয়া আবশ্যিক। দুটো ভিন্ন মাত্রার অপরাধের ঘটনাকে একই পাল্লায় দাঁড় করানো মানে অধিকতর গুরুতর অপরাধের পক্ষ অবলম্বন করা। তাহলে কি বুঝতে হবে যারা হাসিনা ও ইয়াহিয়ার অপরাধ এক পাল্লায় মাপে তারা ইয়াহিয়ার পক্ষে? তারা রাজাকার? রাজাকার না হলেও এটা সত্য যে বুঝে বা না বুঝে তারা যে রাজাকারদের পক্ষে কাজ করছে এ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই।

ছোটবেলায় মানুষের বন্ধুত্ব হয় কোন রকম পূর্ব শর্ত ছাড়াই। পাড়ার বা স্কুলের সাথী। একসাথে খেলাধুলা, পড়াশোনা করতে করতে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। একটা বয়সের পরে এসব বন্ধুত্ব হালকা হয়ে যায়, বিশেষ করে সবাই যখন কলেজ, ইউনিভার্সিটি বা চাকরি জীবনে নতুন বন্ধু পায়। তবে অনেক পরে যখন মানুষ শৈশব সম্পর্কে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে শৈশবের বন্ধুত্ব তখন আবার নতুন করে বেগ পায়। কলেজ, ভার্সিটির বন্ধুত্ব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সচেতন, তা গড়ে ওঠে কোন আদর্শ, হবি বা প্রয়োজনকে ঘিরে। যদি আমরা সম্পর্ক ধরে রাখতে চাই তাহলে নিজেদের মধ্যে বেশি বেশি কমন পয়েন্ট খুঁজে বের করি। ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্ব আত্মিক রূপ নেয়। আর যদি কারো সাথে শত্রুতা করতে চাই তাহলে সেই সব দোষ খুঁজি যা একেবারেই সহ্য করতে পারি না। তবে জীবনে চলার পথে আমরা বদলে যাই, বদলে যায় আমাদের আদর্শ। যদি কেউ মৌলবাদী না হয় এরপরেও বন্ধুদের সাথে একটা চলনসই সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। কারণ আমাদের মতের ঐক্য বা অনৈক্য তো কোন কোন বিষয়ে আর সম্পর্ক আরও অনেক কিছুর সাথে জড়িত। যখন সেই সব লোককে, যারা একসময় জীবন বাজি রেখে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে, রাজপথে একসাথে লড়াই করেছে, পরস্পরকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে দেখি যা আদর্শের সীমানা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যায়, তখন মনে হয় এদের অন্তত একটা অংশ নিজেদের সাথে কখনোই সৎ ছিল না, মানে তাদের লড়াই ছিল প্রগতিশীল আদর্শের ছদ্মবেশে প্রতিক্রিয়ার পক্ষে। বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে এটা আজকাল খুব দেখা যাচ্ছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের বাঁশি প্রথম কখন বেজেছিল? এই প্রশ্ন অনেকের মনেই জাগে। যদিও গর্বাচভের পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্তের দমকা হাওয়া শেষ পর্যন্ত সবকিছুই লন্ডভন্ড করে দেয় তবে এর শুরু কখন তা নিয়ে বিভিন্ন রকমের মতামত আছে। পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্ত অনেকের মতে ছিল ক্যান্সারের থার্ড স্টেজের রুগিকে কেমোথেরাপি দেওয়ার মত, তবে ডাক্তার হিসেবে গর্বাচভ দুর্বলচিত্তের অধিকারী হওয়ায় হিতে বিপরীত হয়েছে। রুগির অকালমৃত্যু না হলেও এতে করে মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছে। অনেকের ধারণা এই পতন তথা পচনের বীজ রোপিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসে যেখানে নিকিতা খ্রুশেভ স্তালিনের ব্যক্তি পূজার মোড়ক উন্মোচন করেন। স্তালিন সাধু সন্ত ছিলেন না, বিনা বিচারে বা বিচারের প্রহসন করে প্রতিপক্ষ নির্মূল করেছেন, তবে এর সাথে খ্রুশেভ সহ অনেকেই জড়িত ছিলেন। স্তালিনকে জনগণের চোখে ছোট করতে গিয়ে সোভিয়েত ব্যবস্থা তথা সমাজতন্ত্রকে অনেক মানুষের চোখে খাটো করেছেন। সমাজতন্ত্র বা সোভিয়েত ব্যবস্থা নিখুঁত ছিল না, এসবের সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু খ্রুশেভের স্তালিন বিরোধিতা যতটা না মৃত স্তালিনের ক্ষতি করেছে তারচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে জীবিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার। কারণ মাত্র কিছুদিন আগেই দেশের মানুষ স্তালিনের নামে যুদ্ধ করে দেশ তথা বিশ্বকে ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছে। তিরিশের দশকের অমানবিক নির্যাতনের স্মৃতি তারা ভুলে গেছে, তাদের চোখের সামনে তখন স্তালিনের একেবারেই ভিন্ন মূর্তি, এ স্তালিন তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। সত্যিকার কমিউনিস্ট যারা রক্ত, ঘাম, কান্নার বিনিময়ে সোভিয়েত ভূমি রক্ষা করেছেন স্তালিনের এই অপমানে দেশের নেতৃত্বের প্রতি তাদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায় আর এই সুযোগে পার্টির নেতৃত্ব চলে যায় সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভীদের হাতে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকার প্রসন্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করার নিমিত্তে ইয়েলৎসিন সহ নব্য রুশ নেতারা সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত নেতাদের দেদার সমালোচনা করেন। সোভিয়েত জনগণের সমস্ত ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় সমাজন্ত্রের ঘাড়ে আর সেটা করে কমিউনিস্ট পার্টির ওভারকোটের পকেট থেকে বেরিয়ে আসা নব্য গণতন্ত্রীরা। নব্বইয়ের দশকের প্রচন্ড রকমের সোভিয়েত বিরোধী রুশ নেতৃত্বের মৌণ সম্মতির সুযোগ নিয়ে পুঁজিবাদী বিশ্ব প্রথমে স্তালিন ও হিটলারকে একই পাল্লায় মাপতে শুরু করে। এখন তো তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ে ২৭ মিলিয়ন সোভিয়েত নাগরিকের আত্মত্যাগ স্বীকার করেই না, উল্টো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে লেখে যেখানে যুদ্ধ শুরুর জন্য জার্মানির পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সমান ভাবে দায়ি করে। যদিও মলোতভ-রবিনট্রপ তথা সোভিয়েত-জার্মান শান্তি চুক্তির অনেক আগেই ফ্রান্স, বৃটেন, পোল্যান্ড জার্মানির সাথে চুক্তি করে হিটলারকে চেকোস্লাভাকিয়া দখলের পথ উন্মুক্ত করে দেয় তবুও ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা স্তালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম জুড়ে নাজি জার্মানি ও হিটলারের দায়ভাগ লাঘব করতে চায়। মেরস, বেরবক সহ বর্তমান জার্মানির ক্ষমতাসীনদের এক বিরাট অংশ গেস্টাপোর অফিসারদের তৃতীয় প্রজন্ম ও যাদের অনেকেই বিভিন্ন ভাবে তাদের দাদা নানাদের সেই সময়ের কাজকর্ম জাস্টিফাই করতে চায়। এর সাথে কি আমাদের দেশের ঘটনার কন মিল নেই? তাই আজ যারা প্রচন্ড আগ্রহের সাথে হাসিনার স্বৈরাচারকে ইয়াহিয়া বা গোলাম আজমের সমতুল্য করে ঢেঁকুর তুলছে এদের হাত ধরেই একদিন একাত্তরকে অস্বীকার করা হবে আওয়ামী স্বৈরাচারের কাজ বলে। সেই সাথে অস্বীকার করা হবে পূর্ববর্তী সমস্ত আন্দোলন, আপনাদের পূর্বসূরী নেতাদের। কারো কোন কাজ যদি তার সংগঠনের আদর্শিক শত্রুর হাত শক্তিশালী করে বা শত্রুর স্বার্থ হাসিল করে তাহলে বুঝতে হবে যে হয় সে গন্ডমূর্খ না হয় অতি চালাক যে ছদ্মবেশে শত্রু শিবিরে অবস্থান করে আসল মিত্রদের সাহায্য করছে। ওকার ভাষায় অনেক কাউয়া ঢুকেছে। বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে এরকম অনেকেরই দেখা মেলে যাদের কোন মতেই মূর্খ বলা যায় না। তাহলে কি তারা সার্জিসদের মত গুপ্ত শিবির যারা প্রগতির বোরকা পরে প্রতিক্রিয়ার চাষ করে যাচ্ছে? যদি তাই হয় তবে সার্জিসদের মত সাহস করে আত্মপ্রকাশ করছে না কেন? নাকি এখনো নিজেদের চুড়ান্ত বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত নয়, তাই ঘাপটি মেরে বসে আছে ভবিষ্যতে বিনাশিতামূলক ঘটনা ঘটাতে ও ভেতর থেকে বাম আন্দোলনের বারোটা বাজাতে? ভুলে গেলে চলবে না যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এসব ছদ্মবেশী প্রগতিশীলদের রাজনৈতিক শত্রু আর আসল বামেরা এদের আদর্শিক শত্রু। বামদের ধ্বংস করা তাদের কাছে ছোয়াব। গাছ ধ্বংস করার আগেই পরগাছা উপড়ে ফেলতে হয়। সময় এসেছে এদের হাত থেকে বাম রাজনীতিকে মুক্ত করার। ভাঙনের ভয়ে কোন রকমে জোড়াতালি দিয়ে চললে ভবিষ্যতে ভাঙন আরো মারাত্মক রূপ নেবে। আর এখন নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ব্যবস্থা নিলে বাইরে থাকা অনেক শুভানুধ্যায়ীরা সেই ক্ষতি পূরণ করবে বলেই আশা করি।

সেদিন এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। কথা প্রসঙ্গে জানাল এক জামায়াত নেতা নাকি টক শোতে বলেছে যাদের ১% জনসমর্থন নেই সেই বামদের সাথে আবার কথা কি।‌যদিও ও নিজে সিপিবির সাথে জড়িত ছিল না, তবে সিপিবি তথা বাম রাজনীতির দুরাবস্থা দেখে হতাশা প্রকাশ করল।‌হ্যাঁ, বাম রাজনীতির এই দুর্দশা আমাদের ব্যথিত করে। মনে হয় এরাও এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত মৌলবাদ তোষণের ট্যাবলেট খেয়ে বসে আছে। ভারত বিদ্বেষ সহ জামায়াত শিবিরের বিভিন্ন বয়ান আজ তাদের বয়ান। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত সবাই ভারতের সাথে সম্পর্ক রেখে চলে, ভারত বিদ্বেষী স্লোগান দিলেও কোন চুক্তি বাতিল করে না বরং ভারত থেকে আজ তেলটা, কাল নুনটা কেনে দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কী ইউনুস সরকার, কী বর্তমান সরকার ভারত থেকে বিভিন্ন সহযোগিতা নেয় নিরুপায় হয়ে। অথচ সেটা যদি পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে করা হত তাহলে দয়া প্রার্থী না হয়ে আমরা পার্টনার হতে পারতাম। সেটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যেই হয়। বারবার যেহেতু প্রমাণিত হচ্ছে ভারতের সহযোগিতা আমাদের জন্য অপরিহার্য তখন কেন সেটাকে যৌথ উদ্যোগে করে দেশের জন্য লাভজনক করে তোলা হবে না? এসব ক্ষেত্রে পার্টি নিঃসন্দেহে তাদের পলিসি পর্যালোচনা করতে পারে।

আমাদের ইতিহাস আপোষের ইতিহাস। আমাদের লড়াই শুধু নিজের দেশের সংস্কৃতি ও বিভিন্ন ধরণের সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের জন্ম ইংরেজদের সাথে আপোষের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে তাদের স্বার্থ হাসিল করার ঘুঁটি হিসেবে। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঙালি বীরের মত লড়ে দেশ স্বাধীন করলেও পরবর্তীতে সে আরব দেশ তথা মুসলিম বিশ্বের সাথে অসমান বন্ধুত্ব করতে গিয়ে একে একে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো আপোষ করতে বাধ্য হয়। আসলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কারো মূল লক্ষ্য যখন হয় শক্তিশালী প্রতিবেশীর বাড়া ভাতে ছাই দেওয়া তখন তাকে দূরবর্তী শক্তিশালী কারো সাথে আঁতাত করতে হয় আর এটা করতে হয় অসম্মানজনক শর্তে। পাকিস্তানের সাথে আমেরিকা ও চীনের চুক্তিগুলোর পরিণাম দেখলেই সেটা বোঝা যায়। ইউনুসের সময় সরকারিভাবে ভারত বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করে। মনে হয় সেটা ইচ্ছাকৃত ভাবে করা হয়েছিল পরবর্তী পর্যায়ে আমেরিকার সাথে বৈষম্যমূলক চুক্তি স্বাক্ষর করার পরিবেশ তৈরি করতে। পার্টির বর্তমান নেতৃত্বের একাংশ তাদের রাজনীতির মূলনীতি হিসেবে যা বেছে নিয়েছে সেটা দিনের শেষে ভারত বিরোধিতা, আওয়ামী লীগ বিরোধিতা হয়ে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী শক্তিকেই শক্তিশালী করে যা পার্টির নীতির পরিপন্থী। আর এজন্যেই দরকার পার্টির পুনর্গঠন।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৩ এপ্রিল ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা (৩৮): কাউয়া  -বিজন সাহা https://share.google/d98uDuB6jDwlMofTj  

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট

বিজন ভাবনা - (২৫) জন্মদিন