বিজন ভাবনা - (৩৯) প্রসঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব
গত সপ্তাহে “কাউয়া” শিরোনামে লেখাটির উপর বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। আজকের আলোচনায় সেসব নিয়েই কিছু কথা বলব বলে ভাবছি।
একটা প্রতিক্রিয়া ছিল এ রকম। আওয়ামী লীগ যদি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ওদের ভোট যদি ইসলাম পন্থিদের + বিএনপির ঘরে না যায় সেটা কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির এক ধরণের ইতিবাচক রূপান্তর। কিন্তু সেটা কি বাস্তবে সম্ভব? মুজিব, হাসিনা অনেক খারাপ কাজ করলেও তাকে পাকিস্তান আর্মি + রাজাকারের সংগে তুলনা করা কিন্তু কমিউনিস্টদের ফ্যাসিস্টদের সংগে তুলনা করার পথ তৈরি করে, স্ট্যালিন, হোক্সা বা পলপট মাও এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবীদের ভাষায় প্রতিবিপ্লবী দমন প্রক্রিয়ার ইতিহাস নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন আছে। গরবাচেভের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পক্ষে যারা ঐ সময় পত্রিকায় লিখেছিলেন তাদের বর্তমান অনুসারিরাই কিন্তু কোন মুক্ত আলোচনা শুরু হলে বিলোপবাদের ট্যাগ লাগান। এই অবস্থায় করণীয় কি হতে পারে ?
সমস্যাটা যতটা না সমালোচনায় তারচেয়ে বেশি এর অতিরঞ্জিত বয়ানে। যোশের বশে কারো মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনা অন্যদের একই রাস্তায় হাঁটার পথ খুলে দেয়। যেমন হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিতে যা নিয়ে গত সপ্তাহে লিখেছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরাই বিকৃত করেছে আর সেই বিকৃতির সুযোগ নিয়ে রাজাকাররা নিজের নিজের বয়ান তৈরি করছে। আসলে একাত্তরের পক্ষের শক্তির এই বিভাজনই বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিশোধ নেবার পথ খুলে দিয়েছে। তবে আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে স্তালিন, মাও, পলপট এদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে সেটা একেবারে মিথ্যা নয়। সেখানে সত্য আছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে সেটা অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রীরা নিজেরাই সেই সমালোচনার ঝাঁপি খুলে দিয়েছে আর পুঁজিবাদী বিশ্ব সেটা সাগ্রহে লুফে নিয়েছে। যেকোনো ঘটনার বা ইতিহাসের বিকৃতি, তা সে পজিটিভ হোক আর নেগেটিভ হোক, ক্ষতিকর। কারণ সেটা অন্যদেরকে নিজের মত করে ইতিহাস লেখার সুযোগ করে দেয়। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পরে শেখ মুজিবের নাম বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে দেবার চেষ্টা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ক্ষতিকর হাসিনা সরকারের আমলে শেখ মুজিবকেই স্বাধীনতার একমাত্র নায়ক হিসেবে দেখানো। দুটোই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, তাকে যদি বিকৃত ভাবে প্রকাশ করা হয় সেটা এক সময় বুমেরাঙের মত ফিরে আসে। সাময়িক ভাবে কিছু সুবিধা দিলেও একদিন না একদিন ইতিহাস সুদে আসলে সব ফিরিয়ে দেয়। আর একারণেই শেখ হাসিনা ও ইয়াহিয়া খানকে এক আসনে বসানো ধৃষ্টতা বলে মনে করি। এটা আর যাই হোক সিপিবি সহ বাম দলগুলোর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না, বরং তাদের ক্ষতিই করবে। কারণ এসব পপুলিস্টিক স্লোগান দিয়ে বামেরা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সমর্থন পাবে না, উল্টো স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির একটা অংশের সমর্থন হারাবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালিজম এখন ক্যাপিটালিস্ট গ্লোবালাইজেশনের দ্বারা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চলছে। সোভিয়েত বিপর্যয় ও চীনের উত্থান প্রমাণ করে যে সমাজতন্ত্রের অনেক স্বপ্নের বাস্তবায়ন পুঁজিবাদের অর্থনীতি ছাড়া সম্ভব নয়। অন্তত উৎপাদনে পুজিবাদী সম্পর্কের কিছু কিছু উপাদান ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ একমাত্র প্রতিযোগিতাই শ্রমিককে বেশি করে ভালো পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই ম্যাটেরিয়াল স্টিমুল ছিল না বলেই অধিকাংশ মানুষ দায়সারা গোছের কাজ করেছে যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। লেনিন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই নিউ ইকোনমিক পলিসি প্রনয়ণ করেন। আমার ধারণা নীতিগত ভাবে অনেক ফ্লেক্সিবিলিটি দরকার। অন্ধ বিশ্বাস নয় তত্ত্বের প্র্যাগমাটিক প্রয়োগ দরকার। সবার জন্য সুন্দর জীবন – এটা শুধু আদর্শ দিয়ে হয় না, এর জন্য দরকার অর্থনৈতিক ভিত্তি যা দিতে পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। অন্য দিকে সবার মঙ্গলের জন্য দরকার সমাজতান্ত্রিক বন্টন ব্যবস্থা। বিজ্ঞান যেমন ট্রায়াল এন্ড এরোর মেথড অবলম্বন করে এখানেও স্বল্প মাত্রায় সেটা করা যায়। এক কংগ্রেস থেকে আরেক কংগ্রেস নয়, দরকার অনবরত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা। এটা সংশোধন নয় এটা জীবনের চাহিদা। অর্থাৎ অনেক বিষয়ে মন খোলা রাখা। আমাদের তাত্ত্বিকরা পান থেকে চুন খসলেই যে কাউকে সংশোধনবাদী ট্যাগ দেবার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে সরে আসতে হবে। কারণ দিনের শেষে মানুষের মঙ্গল - এটাই আদর্শের মূল কথা।
আরেক প্রতিক্রিয়ায় একজন লিখলেন যে কমিউনিজম একটি বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার জন্য সময়, স্থান ও চলমান বাস্তবতার ভিত্তিতে অনেক কিছু পরিবর্তন হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা করবে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি। আবার কৌশলগত পরিবর্তন যেটাই হোক না কেনো, চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির আবশ্যকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আমাদের দেশের জন্য কথাটি হয়তো সত্য, কিন্তু প্রায় ৪৩ বছর রাশিয়ায় বসবাস করে, সমাজতন্ত্র, নব্বইয়ের দশকের অরাজকতা ও নতুন রাশিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা প্লাস বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে যেটা মনে হয়েছে তা হল একটি পর্যায় পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রয়োজন হলেও যদি সময় মত সবার অধিকার সমান করা না যায় তবে বিপদ আসন্ন। এই যে আমরা শ্রমিকের একনায়কত্বের কথা বলি তার মূল কারণ শ্রমিক বঞ্চিত। এই বঞ্চনা থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ ও ক্ষোভ থেকে বিপ্লব। যদি বঞ্চিত শ্রমিক ক্ষুব্ধ হতে পারে অন্যেরা হতে পারবে না কেন? তাছাড়া যে সময় শ্রমিকের একনায়কত্বের কথা বলা হয়েছে তখন সমাজে শ্রমিকের সার্বিক অবস্থান আজকের চেয়ে ভিন্ন ছিল। যদিও সে সময় সংখ্যার দিক থেকে কৃষক কম ছিল না, তবে শ্রমিক যেহেতু কারখানায় কাজ করত ও স্বাভাবিক ভাবেই ঐক্যবদ্ধ ছিল তাই তাদের উপর বিপ্লবের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তখন কলের চাকা ঘুরানোর ক্ষেত্রে শ্রমিকের বিকল্প ছিল না। বর্তমানে কলের চাকা ঘোরানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক হচ্ছে পরিষেবা কর্মী। মালিক যতই বিনিয়োগ করুক, শ্রমিক যতই উৎপাদন করুক না কেন, যদি পরিষেবা কর্মীরা সেটা বিক্রি করতে না পারে তাহলে যেকোনো ব্যবসাই লাটে উঠতে বাধ্য। অন্যদিকে সমাজ শুধু শ্রমিক দিয়ে চলে না, সেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষ দরকার যাদের সবাই শ্রমিক নয়। শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার থেকে শুরু করে সমাজের এক বিশাল অংশ উৎপাদনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু এরা ছাড়াও সমাজ অচল। এরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এদেরকেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। দিতে হবে সামাজিক মর্যাদা। দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনের সাথে জড়িত না থাকলেও জনমত গড়ায় এদের ভুমিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি বই কম নয়। তাছাড়া শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য তো এদেরই কিনতে হবে। তবে এরা যাতে কেনে সেজন্যে যথেষ্ট পরিমান পণ্য থাকতে হবে যা থেকে এরা বাছাই করে নিতে পারে। একদিকে আমরা শোষণ মুক্ত সমাজের কথা বলব, অন্যদিকে শ্রমিকের একনায়কত্ব কায়েম করে শোষক বদলাব – সেটা তো হয় না। আসলে আজ যাদের পেটে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, অসুখে চিকিৎসা নেই, একবার এগুলো পেলে তাদের নতুন নতুন চাহিদা দেখা দেবে। সেটা আমরা নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। মৌলিক অধিকার ততটা মৌলিক নয় যা আমরা মনে করি। একটা অধিকার অর্জনের সাথে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয়। ছাত্রের চাহিদা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট। কিন্তু সেটা পাবার সাথে সাথে তার নতুন চাহিদা তৈরি হয়, চাকরির চাহিদা। একই কথা বলা চলে জীবনের সব ক্ষেত্রে। একসময় টেলিফোন খুব কম লোকের ঘরেই ছিল, কিন্তু আজ আমরা টেলিফোন ছাড়া নিজেদের কল্পনা করতে পারি না, সেটা গরীব, ধনী, ছোট, বড় নির্বিশেষে। মানে টেলিফোন আজ জীবনের অপরিহার্য উপাদান হয়ে গেছে। একই ভাবে জীবনের সব ক্ষেত্রেই অনবরত পরিবর্তন আসছে। সময় মত সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে না পারলে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নেও হয়েছিল। আর তাই মানুষ প্রায় বিনা প্রতিবাদে দেশটি ভেঙ্গে যেতে দেখেছিল। ভবিষ্যতে যে অন্য কোন দেশের সাথে এমনটা ঘটবে না সেটা কে বলতে পারে?
আমরা যখন মার্ক্সবাদের ভিত্তিতে শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলি তখন সাধারণত তাদের দুর্বিষহ জীবনের চিত্রটা মাথায় রেখে বলি। মানবেতর অবস্থা থেকে তাদের কিছুটা হলেও উন্নত মানের জীবন নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু এর পরে কি? যখন ন্যুনতম চাহিদা মিটবে এরপরে কি সে ব্যাপার নিয়ে মনে হয় ততটা ভাবি না। বা ভাবলেও ঠিক সেভাবে ভাবি না যেভাবে পুঁজিবাদীরা ভাবে। মুনাফার জন্য পুঁজিবাদীরা মানুষের সামনে নতুন নতুন খেলনা নিয়ে আসে, কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা শুধু প্রান্তিক মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায় বা দায়িত্ব শেষ করতে চায়, যদি কেউ একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে, ভালো থাকে তাহলে তাকে জোতদার, বুর্জোয়া এসব ট্যাগ দিয়ে সামাজিক ভাবে হেয় করতে চায়। অন্তত সোভিয়েত ইউনিয়নে এসব ঘটেছে। আমাদের সুযোগ আছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের সাইকোলজি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজ তত্ত্বের পরিবর্তন করার। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, আছে অনবরত নিজেকে সংশোধন করে সত্যর সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া। সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির আবশ্যকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সাধারণত এসব পার্টির নেতৃত্বে থাকে বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত, যারা ক্ষমতায় গেলে কতটুকু শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করবে আর কতটা নিজেদের উচ্চাভিলাষ পূরণ করবে তার উপর নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য। একাত্তর বছর কী দীর্ঘ? ইতিহাস বলে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি যদি সময় মত নিজেকে সত্যিকার অর্থে সকল স্তরের মানুষের পার্টিতে (অবশ্যই সোভিয়েত স্টাইলে নয়, যেখানে সব শ্রেণীর মানুষ পার্টি সদস্য হত হয় বাধ্য হয়ে না হয় ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে) পরিণত করতে না পারে ততদিন প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা থেকেই যাবে। এই সমস্যা ব্যক্তির সাথে সমষ্টির। ব্যক্তি নিয়েই সমষ্টি, সমষ্টি ভালো না থাকলে যেমন ব্যক্তি পুরাপুরি ভালো থাকে না, তেমনি ব্যক্তি ভালো না থাকলে সমষ্টিও রুগ্ন হয়। সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ যাই বলি যদি ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে মধ্যপন্থা বের করা না যায় তাহলে বিপদ আসবেই। এই বিপদ মিনিমাইজ করার জন্য দরকার ফ্লেক্সিবিলিটি।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১০ এপ্রিল প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা(৩৯): প্রসঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব -বিজন সাহা https://share.google/Xwo4IbxIaJWfLa9DN
একটা প্রতিক্রিয়া ছিল এ রকম। আওয়ামী লীগ যদি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ওদের ভোট যদি ইসলাম পন্থিদের + বিএনপির ঘরে না যায় সেটা কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির এক ধরণের ইতিবাচক রূপান্তর। কিন্তু সেটা কি বাস্তবে সম্ভব? মুজিব, হাসিনা অনেক খারাপ কাজ করলেও তাকে পাকিস্তান আর্মি + রাজাকারের সংগে তুলনা করা কিন্তু কমিউনিস্টদের ফ্যাসিস্টদের সংগে তুলনা করার পথ তৈরি করে, স্ট্যালিন, হোক্সা বা পলপট মাও এর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ে বিপ্লবীদের ভাষায় প্রতিবিপ্লবী দমন প্রক্রিয়ার ইতিহাস নিয়েও কিন্তু প্রশ্ন আছে। গরবাচেভের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পক্ষে যারা ঐ সময় পত্রিকায় লিখেছিলেন তাদের বর্তমান অনুসারিরাই কিন্তু কোন মুক্ত আলোচনা শুরু হলে বিলোপবাদের ট্যাগ লাগান। এই অবস্থায় করণীয় কি হতে পারে ?
সমস্যাটা যতটা না সমালোচনায় তারচেয়ে বেশি এর অতিরঞ্জিত বয়ানে। যোশের বশে কারো মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনা অন্যদের একই রাস্তায় হাঁটার পথ খুলে দেয়। যেমন হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতিতে যা নিয়ে গত সপ্তাহে লিখেছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরাই বিকৃত করেছে আর সেই বিকৃতির সুযোগ নিয়ে রাজাকাররা নিজের নিজের বয়ান তৈরি করছে। আসলে একাত্তরের পক্ষের শক্তির এই বিভাজনই বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিশোধ নেবার পথ খুলে দিয়েছে। তবে আমাদের এটাও বুঝতে হবে যে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে স্তালিন, মাও, পলপট এদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে সেটা একেবারে মিথ্যা নয়। সেখানে সত্য আছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে সেটা অতিরঞ্জিত করে বর্ণনা করা হয়েছে। সমাজতন্ত্রীরা নিজেরাই সেই সমালোচনার ঝাঁপি খুলে দিয়েছে আর পুঁজিবাদী বিশ্ব সেটা সাগ্রহে লুফে নিয়েছে। যেকোনো ঘটনার বা ইতিহাসের বিকৃতি, তা সে পজিটিভ হোক আর নেগেটিভ হোক, ক্ষতিকর। কারণ সেটা অন্যদেরকে নিজের মত করে ইতিহাস লেখার সুযোগ করে দেয়। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পরে শেখ মুজিবের নাম বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে দেবার চেষ্টা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ক্ষতিকর হাসিনা সরকারের আমলে শেখ মুজিবকেই স্বাধীনতার একমাত্র নায়ক হিসেবে দেখানো। দুটোই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। সত্য হোক আর মিথ্যা হোক, তাকে যদি বিকৃত ভাবে প্রকাশ করা হয় সেটা এক সময় বুমেরাঙের মত ফিরে আসে। সাময়িক ভাবে কিছু সুবিধা দিলেও একদিন না একদিন ইতিহাস সুদে আসলে সব ফিরিয়ে দেয়। আর একারণেই শেখ হাসিনা ও ইয়াহিয়া খানকে এক আসনে বসানো ধৃষ্টতা বলে মনে করি। এটা আর যাই হোক সিপিবি সহ বাম দলগুলোর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না, বরং তাদের ক্ষতিই করবে। কারণ এসব পপুলিস্টিক স্লোগান দিয়ে বামেরা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সমর্থন পাবে না, উল্টো স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির একটা অংশের সমর্থন হারাবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালিজম এখন ক্যাপিটালিস্ট গ্লোবালাইজেশনের দ্বারা প্রতিস্থাপনের চেষ্টা চলছে। সোভিয়েত বিপর্যয় ও চীনের উত্থান প্রমাণ করে যে সমাজতন্ত্রের অনেক স্বপ্নের বাস্তবায়ন পুঁজিবাদের অর্থনীতি ছাড়া সম্ভব নয়। অন্তত উৎপাদনে পুজিবাদী সম্পর্কের কিছু কিছু উপাদান ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ একমাত্র প্রতিযোগিতাই শ্রমিককে বেশি করে ভালো পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই ম্যাটেরিয়াল স্টিমুল ছিল না বলেই অধিকাংশ মানুষ দায়সারা গোছের কাজ করেছে যা শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। লেনিন সেটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই নিউ ইকোনমিক পলিসি প্রনয়ণ করেন। আমার ধারণা নীতিগত ভাবে অনেক ফ্লেক্সিবিলিটি দরকার। অন্ধ বিশ্বাস নয় তত্ত্বের প্র্যাগমাটিক প্রয়োগ দরকার। সবার জন্য সুন্দর জীবন – এটা শুধু আদর্শ দিয়ে হয় না, এর জন্য দরকার অর্থনৈতিক ভিত্তি যা দিতে পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। অন্য দিকে সবার মঙ্গলের জন্য দরকার সমাজতান্ত্রিক বন্টন ব্যবস্থা। বিজ্ঞান যেমন ট্রায়াল এন্ড এরোর মেথড অবলম্বন করে এখানেও স্বল্প মাত্রায় সেটা করা যায়। এক কংগ্রেস থেকে আরেক কংগ্রেস নয়, দরকার অনবরত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা। এটা সংশোধন নয় এটা জীবনের চাহিদা। অর্থাৎ অনেক বিষয়ে মন খোলা রাখা। আমাদের তাত্ত্বিকরা পান থেকে চুন খসলেই যে কাউকে সংশোধনবাদী ট্যাগ দেবার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেখান থেকে সরে আসতে হবে। কারণ দিনের শেষে মানুষের মঙ্গল - এটাই আদর্শের মূল কথা।
আরেক প্রতিক্রিয়ায় একজন লিখলেন যে কমিউনিজম একটি বিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার জন্য সময়, স্থান ও চলমান বাস্তবতার ভিত্তিতে অনেক কিছু পরিবর্তন হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা করবে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি। আবার কৌশলগত পরিবর্তন যেটাই হোক না কেনো, চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব। শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্বের লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির আবশ্যকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আমাদের দেশের জন্য কথাটি হয়তো সত্য, কিন্তু প্রায় ৪৩ বছর রাশিয়ায় বসবাস করে, সমাজতন্ত্র, নব্বইয়ের দশকের অরাজকতা ও নতুন রাশিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা প্লাস বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে যেটা মনে হয়েছে তা হল একটি পর্যায় পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রয়োজন হলেও যদি সময় মত সবার অধিকার সমান করা না যায় তবে বিপদ আসন্ন। এই যে আমরা শ্রমিকের একনায়কত্বের কথা বলি তার মূল কারণ শ্রমিক বঞ্চিত। এই বঞ্চনা থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ ও ক্ষোভ থেকে বিপ্লব। যদি বঞ্চিত শ্রমিক ক্ষুব্ধ হতে পারে অন্যেরা হতে পারবে না কেন? তাছাড়া যে সময় শ্রমিকের একনায়কত্বের কথা বলা হয়েছে তখন সমাজে শ্রমিকের সার্বিক অবস্থান আজকের চেয়ে ভিন্ন ছিল। যদিও সে সময় সংখ্যার দিক থেকে কৃষক কম ছিল না, তবে শ্রমিক যেহেতু কারখানায় কাজ করত ও স্বাভাবিক ভাবেই ঐক্যবদ্ধ ছিল তাই তাদের উপর বিপ্লবের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তখন কলের চাকা ঘুরানোর ক্ষেত্রে শ্রমিকের বিকল্প ছিল না। বর্তমানে কলের চাকা ঘোরানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক হচ্ছে পরিষেবা কর্মী। মালিক যতই বিনিয়োগ করুক, শ্রমিক যতই উৎপাদন করুক না কেন, যদি পরিষেবা কর্মীরা সেটা বিক্রি করতে না পারে তাহলে যেকোনো ব্যবসাই লাটে উঠতে বাধ্য। অন্যদিকে সমাজ শুধু শ্রমিক দিয়ে চলে না, সেখানে বিভিন্ন পেশার মানুষ দরকার যাদের সবাই শ্রমিক নয়। শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার থেকে শুরু করে সমাজের এক বিশাল অংশ উৎপাদনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু এরা ছাড়াও সমাজ অচল। এরাও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এদেরকেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে। দিতে হবে সামাজিক মর্যাদা। দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনের সাথে জড়িত না থাকলেও জনমত গড়ায় এদের ভুমিকা শ্রমিকের চেয়ে বেশি বই কম নয়। তাছাড়া শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য তো এদেরই কিনতে হবে। তবে এরা যাতে কেনে সেজন্যে যথেষ্ট পরিমান পণ্য থাকতে হবে যা থেকে এরা বাছাই করে নিতে পারে। একদিকে আমরা শোষণ মুক্ত সমাজের কথা বলব, অন্যদিকে শ্রমিকের একনায়কত্ব কায়েম করে শোষক বদলাব – সেটা তো হয় না। আসলে আজ যাদের পেটে ভাত নেই, পরনে কাপড় নেই, অসুখে চিকিৎসা নেই, একবার এগুলো পেলে তাদের নতুন নতুন চাহিদা দেখা দেবে। সেটা আমরা নিজেদের জীবনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। মৌলিক অধিকার ততটা মৌলিক নয় যা আমরা মনে করি। একটা অধিকার অর্জনের সাথে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয়। ছাত্রের চাহিদা পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট। কিন্তু সেটা পাবার সাথে সাথে তার নতুন চাহিদা তৈরি হয়, চাকরির চাহিদা। একই কথা বলা চলে জীবনের সব ক্ষেত্রে। একসময় টেলিফোন খুব কম লোকের ঘরেই ছিল, কিন্তু আজ আমরা টেলিফোন ছাড়া নিজেদের কল্পনা করতে পারি না, সেটা গরীব, ধনী, ছোট, বড় নির্বিশেষে। মানে টেলিফোন আজ জীবনের অপরিহার্য উপাদান হয়ে গেছে। একই ভাবে জীবনের সব ক্ষেত্রেই অনবরত পরিবর্তন আসছে। সময় মত সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে না পারলে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নেও হয়েছিল। আর তাই মানুষ প্রায় বিনা প্রতিবাদে দেশটি ভেঙ্গে যেতে দেখেছিল। ভবিষ্যতে যে অন্য কোন দেশের সাথে এমনটা ঘটবে না সেটা কে বলতে পারে?
আমরা যখন মার্ক্সবাদের ভিত্তিতে শ্রমিকদের অধিকারের কথা বলি তখন সাধারণত তাদের দুর্বিষহ জীবনের চিত্রটা মাথায় রেখে বলি। মানবেতর অবস্থা থেকে তাদের কিছুটা হলেও উন্নত মানের জীবন নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু এর পরে কি? যখন ন্যুনতম চাহিদা মিটবে এরপরে কি সে ব্যাপার নিয়ে মনে হয় ততটা ভাবি না। বা ভাবলেও ঠিক সেভাবে ভাবি না যেভাবে পুঁজিবাদীরা ভাবে। মুনাফার জন্য পুঁজিবাদীরা মানুষের সামনে নতুন নতুন খেলনা নিয়ে আসে, কিন্তু সমাজতন্ত্রীরা শুধু প্রান্তিক মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায় বা দায়িত্ব শেষ করতে চায়, যদি কেউ একটু ভালো থাকার চেষ্টা করে, ভালো থাকে তাহলে তাকে জোতদার, বুর্জোয়া এসব ট্যাগ দিয়ে সামাজিক ভাবে হেয় করতে চায়। অন্তত সোভিয়েত ইউনিয়নে এসব ঘটেছে। আমাদের সুযোগ আছে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষের সাইকোলজি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজ তত্ত্বের পরিবর্তন করার। মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, আছে অনবরত নিজেকে সংশোধন করে সত্যর সন্ধানে এগিয়ে যাওয়া। সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির আবশ্যকতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সাধারণত এসব পার্টির নেতৃত্বে থাকে বুদ্ধিজীবী ও মধ্যবিত্ত, যারা ক্ষমতায় গেলে কতটুকু শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করবে আর কতটা নিজেদের উচ্চাভিলাষ পূরণ করবে তার উপর নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য। একাত্তর বছর কী দীর্ঘ? ইতিহাস বলে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি যদি সময় মত নিজেকে সত্যিকার অর্থে সকল স্তরের মানুষের পার্টিতে (অবশ্যই সোভিয়েত স্টাইলে নয়, যেখানে সব শ্রেণীর মানুষ পার্টি সদস্য হত হয় বাধ্য হয়ে না হয় ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারে) পরিণত করতে না পারে ততদিন প্রতিবিপ্লবের সম্ভাবনা থেকেই যাবে। এই সমস্যা ব্যক্তির সাথে সমষ্টির। ব্যক্তি নিয়েই সমষ্টি, সমষ্টি ভালো না থাকলে যেমন ব্যক্তি পুরাপুরি ভালো থাকে না, তেমনি ব্যক্তি ভালো না থাকলে সমষ্টিও রুগ্ন হয়। সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ যাই বলি যদি ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে মধ্যপন্থা বের করা না যায় তাহলে বিপদ আসবেই। এই বিপদ মিনিমাইজ করার জন্য দরকার ফ্লেক্সিবিলিটি।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ১০ এপ্রিল প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বিজন ভাবনা(৩৯): প্রসঙ্গ শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব -বিজন সাহা https://share.google/Xwo4IbxIaJWfLa9DN

Comments
Post a Comment