বিজন ভাবনা - (৪৩) পশ্চিম বঙ্গে নির্বাচন – বিচ্ছিন্ন ভাবনা
পশ্চিম বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে এবার বাংলাদেশে যত উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা গেছে সেটা এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে করতে পারছি না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিম বঙ্গে প্রচুর উদ্দীপনা ছিল। তবে ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই আবেগে ভাঁটা পড়ে। এরপর আবার উচ্ছ্বাস দেখা যায় ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সময়। কোলকাতার শিল্পীদের অনেকেই ঢাকায় এসে আন্দোলনে সমর্থন ঘোষণা করে। অনেকে রচনা করেন গান। তবে শেখ হাসিনার সরকার মৌলবাদীদের সাথে আপোষের পথ বেছে নিলে আবেগের নদী আবার জলশূন্য হতে শুরু করে। ২০১৭ সালে প্রখ্যাত লেখক দ্বিজেন শর্মার উপদেশে “একাত্তরের সাত সতেরো” নামে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির উপর আমার একটি বই আনন্দ পাবলিশার্সে পাঠালে “বাংলাদেশ নিয়ে পশ্চিম বঙ্গের মানুষের এখন আর কোন আবেগ নেই” অজুহাতে ওরা সেটা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে হঠাৎ করেই পশ্চিম বাংলা, বিশেষ করে কোলকাতা বাংলাদেশ নিয়ে সরব হয়ে ওঠে ২০২৪ সালে ছাত্রজনতার হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের সময়। এমন কি আবু সাইদের মৃত্যু নিয়ে প্রথম পোস্টার ছাপা হয় কোলকাতার শিল্পীদের দ্বারাই। কিছু কিছু সাংবাদিক ও ব্লগারের সেই সময়কার ভিডিও দেখে মনে হত এরাও মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ। বাংলাদেশে জামায়াত চক্র যেমন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিল, এরাও পশ্চিম বঙ্গে আওয়ামী বিরোধী জনমত গড়ে তোলে। এমনকি আওয়ামী পরবর্তী ইউনুস শাসনামলেও এরা পূর্বের ন্যারেটিভ প্রচার করতে থাকে। এরা তৃণমূল সরকার পতনে কোন ভূমিকা রেখেছে কিনা সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। কারণ ইউনুস সরকার প্রথম থেকেই ভারত বিরোধী অবস্থান নিয়ে এই অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বিজেপির আগমন সেই উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশে পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের মূল কারণ বিজেপির উত্থান। তবে আজ যারা বিজেপির বিরোধিতা করছে তারাই বিজেপির উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। মানুষ তো বটেই বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার নিরাপত্তা। আমাদের লেখাপড়া, চাকরি বাকরি, ক্যারিয়ার – সবই নিরাপত্তার জন্য। নিরাপত্তা কি? নিজের মত করে জীবন যাপনের গ্যারান্টি। ভালো, মন্দ, ঠিক, বেঠিক – সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা সে চায় নিজের মত করে, নিজের বিশ্বাস নিয়ে নির্বিঘ্নে দিন কাটাতে। তাই যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেভেন সিস্টার্স ও কোলকাতা দখলের হুমকি দেয় তখন সধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। সে নিরাপত্তা চায় সরকারের কাছে, সে চায় সরকার ভোটের হিসাব করে উগ্রবাদীদের সাথে ইঁদুর বিড়াল না খেলে তাদের পাশে দাঁড়াক, তাদের স্বার্থ রক্ষা করুক। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, পুড়িয়ে হত্যা তাদের ভীত করে। অন্য দিকে পশ্চিম বঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় পূজা করতে বাধা দেয়া সহ বিভিন্ন উগ্র সাম্প্রদায়িক তৎপরতা তাদের অসহায় বোধ করতে বাধ্য করে। আর অসহায় মানুষ যে তাকে একটু সান্ত্বনা দেয়, সাহস যোগায় তাকে বিশ্বাস করে বা করতে চায়। কী বাংলাদেশে, কী পশ্চিম বঙ্গে - সরকার জনগণের স্বার্থ, তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে খুব একটা ভেবেছে বলে মনে হয় না। তাদের একটাই লক্ষ্য – ক্ষমতা। আর তার ফলস্বরূপ মৌলবাদীদের তোষণ। এক্ষেত্রে বাম দলগুলোও খুব একটা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়নি। দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো মানেই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো নয়। হায়েনা দুর্বল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়ের বিরুদ্ধে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা প্রায়ই এই ভুলটি করি আর বাছবিচার না করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল গোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াই যদিও সবল গোষ্ঠীর অনেক ব্যক্তি দুর্বল হতে পারে ও দুর্বল গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত হতে পারে। আর এসব কারণেই বিভিন্ন আশঙ্কা সত্ত্বেও মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – ভোট দিয়েছে যতটা না বিজেপির পক্ষে তারচেয়ে বেশি তৃণমূলের বিপক্ষে।
যদিও ১৯৪৭ সালের পর থেকে বিগত প্রায় ৮০ বছরে দুই বাংলা দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেছে; ভিন্ন তাদের পথ, ভিন্ন তাদের লক্ষ্য; তবে বিগত প্রায় পনেরো বছর তাদের রাজনৈতিক নদী একই খাতে প্রবাহিত হয়েছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ আর পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল – দুই দলই চেষ্টা করেছে নিজ নিজ দেশের বিরোধী দলকে ধূলায় মিশিয়ে দিতে। আর সেই সুযোগ নিয়ে মৌলবাদী শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসেছে।
মানুষের অন্যতম প্রধান দোষ হচ্ছে অন্যের সমালোচনা করা। অবশ্য তাকে অন্যতম প্রধান গুনও বলা যায়। কেননা যার সমালোচনা করা হয় সে যদি বিচক্ষণ হয় তবে নিজেকে শোধরাতে পারে, ভবিষ্যতে নিজেকে আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ফলে পরনিন্দা, পরচর্চা দিনের শেষে পরোপকার হতে পারে। অন্য দিকে বিচক্ষণ মানুষ আত্মসমালোচনা করতেই বেশি পছন্দ করে। তাতে সে নিজের দোষত্রুটি সম্পর্কে সচেতন হয়। যে কেউ চাইলে এটাকে স্বার্থপরতা হিসেবে গণ্য করতে পারে। তবে মানুষের উপকার করার প্রবৃত্তি থেকেই হোক আর পরশ্রীকাতরতা থেকেই হোক – আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অন্যের সমালোচনা করেই সুখ পায়। নিজের সাফল্য যদি না থাকে তাহলে অন্যের ব্যর্থতায় খুশি হতে তারা মোটেও আপত্তি করে না। আর যদি অন্যেরা ব্যর্থ না হয় তাহলে তাদের ব্যর্থ হবার জন্য দোয়া বা প্রার্থনা করতেও কুন্ঠা বোধ করে না। এই তো সেদিন যখন রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর খবর এলো তখন এ নিয়ে উছ্বাসের পাশাপাশি কিছু কিছু স্ট্যাটাস দেখলাম আসন্ন বিপর্যয়ের কামনা করে। এতে লাভ? ঐ যে বলেছিলাম না আমাদের দেশে এসব মানায় না – নিজের এই ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণ করার জন্য হলেও বিপর্যয় দরকার। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ আরকি।
কী আমাদের দেশে, কী অন্য দেশে - জনগণ সবসময়ই রিসিভিং এন্ডে থাকে। ডান হোক আর বাম হোক - সবাই নিজেদের ব্যর্থতা জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিব্যি হাঁসের মত সাঁতার কেটে বেড়ায় নিজেদের তৈরি রাজনৈতিক ডোবায়। পশ্চিম বঙ্গের রাজ্যসভায় নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবি সেটা আবার প্রমাণ করল। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। হিলারি ক্লিন্টন পর্যন্ত নিজের পরাজয়ের দায় রাশিয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে অনেক নাটক করেছিলেন আর সেটা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টায় আমেরিকা রাজকোষ থেকে মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। আগেই বলেছি বিজেপির ক্ষমতায় আরোহণে যারা মর্মাহত তারা যতটা না তৃণমূলের পতনে তারচেয়ে বেশি বিজেপির উত্থানে। কিন্তু অন্যান্য যেসব দল অল্টারনেটিভ হতে পারত সেই কংগ্রেস বা সিপিএমকে কিন্তু তৃণমূল নিজেই সমূলে উৎপাটন করেছে বা করার চেষ্টা করেছে ঠিক যেমন করেছিল আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের অপশাসনে কারণেই জনগণ তাদের ত্যাগ করেছে। যখন দুঃশাসন মানুষের গলায় ফাঁসের মত চেপে বসে সে তখন কে তাকে মুক্তি দিল সেটা নিয়ে ভাবে না, সে যে কারো বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে। পশ্চিম বঙ্গে সেই অর্থে কোন বিকল্প হাত ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে বিজেপি আর এ কারণেই জনগণ বিজেপির শরণাপন্ন হয়েছে। তাই যারা জনগণকে দোষারোপ করছে তারা ভুল করছে। কেন আমাদের দেশগুলোয় এমনকি সারা বিশ্বে ডানপন্থী শক্তির উত্থান হচ্ছে সেটা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। তবে এটা ঠিক যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শক্তি গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা করে না বলেই উগ্রপন্থীদের এই জয়জয়কার। সেই অর্থে গেল গেল বলে চিৎকার করার আগে নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরাতে হবে। একদিকে আমরা নিজেদের দেশে চরম অরাজকতা কায়েম করব আর অন্য দেশে ন্যায়ের শাসন দাবি করব সেটা তো হয় না। আমরা চাই বা না চাই – বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি খোলামেলা, পরস্পরের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এক দেশে কিছু একটা ঘটলে তার প্রভাব পড়ে অন্য দেশের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে। যখন ইন্টারনেট ছিল না, অন্য দেশের সব কিছু ছিল চক্ষুর আড়ালে বা চোখে সেটাই পড়ত যা সেই দেশের সরকার বাইরে আসতে দিত – তখন ছিল ভিন্ন কথা। এখন মুহূর্তের মধ্যে ভালোমন্দ সবকিছু চোখের সামনে চলে আসে, সেটা মানুষকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। তাই পাশের দেশে সুস্থ পরিবেশ চাইলে নিজের দেশে আগে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আশির দশকে বলা হত পারমাণবিক যুদ্ধে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে ধ্বংস করবে। ধ্বংস হবার ভয়ই তাদের সরাসরি যুদ্ধে না নামতে বাধ্য করেছিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের জায়গা নিয়েছে তথ্য। এই তথ্য এখন মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। সেটা যাতে না ঘটে সেজন্য দরকার সংযম, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযত আচরণ। যতদিন না আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারব ততদিন বিভিন্ন দেশে শত্রুভাবাপন্ন সরকার গঠিত হবে। এটা মানুষের ইনস্টিংক্ট। জনগণ কোন তন্ত্র বোঝে না। সে চায় সুশাসন, কাজ ও জীবনের নিরাপত্তা। চায় কোন কিছু বিশ্বাস করা বা না করার স্বাধীনতা। যদি কোন সরকার সেটা নিশ্চিত করতে না পারে তবে মানুষ তার উপর আস্থা হারায়।
আমাদের লোকজন যতটা না নিজের দেশের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামায় তারচেয়ে বেশি উত্তেজিত হয় আমেরিকা, ইন্ডিয়া এসব দেশের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে। এক্ষেত্রে ভ্লাদিমির পুতিন ও রাশিয়ার অবস্থান উল্লেখ করা যেতে পারে – “অন্য দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন করে সেই দেশের জনগণ নিজ নিজ বিবেচনা থেকে। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছুই নেই। তারা যাদের নির্বাচন করে তাদের নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। আর সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নির্ভর করবে দুই পক্ষের উপর।” আমাদের মনে রাখতে হবে যে পশ্চিম বঙ্গ ভারতের একটি প্রদেশ। ভাষা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের খুব কাছের হলেও বিদেশ। সেদেশের বা সে প্রদেশের মানুষ নিজেদের জন্য সরকার নির্বাচন করবে। আমাদের কথা ভাবার অবকাশ বা দায়িত্ব তাদের নেই। তবে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ যে তাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে সেটাই স্বাভাবিক, যেমন সত্য উল্টোটাও। আমরা পুঁজিবাদী সমাজে বাস করি এবং পুঁজিবাদে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যথেষ্ট অবদান আছে। তারপরেও ক্ষমতা লাভের পর প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল এখন সামন্তবাদী হয়ে ওঠে, যেনতেন প্রকারেণ ক্ষমতার চাবিকাঠি নিজেদের হাতে ধরে রাখতে চায়। মানুষ তখন আর নাগরিক থাকে না, ক্ষমতাসীনদের কাছে তারা হয় ক্রীতদাস। কিন্তু যে মানুষ একবার স্বাধীনতার স্বাদ পায় দুই দিন আগে হোক আর দুই দিন পরে হোক, সে বিদ্রোহ করে, সুযোগ খোঁজে নব্য জমিদারের হাত থেকে মুক্তি লাভের। কোথাও সেটা আসে গণ অভ্যুত্থানে কোথাও ভোটের বাক্সে। পছন্দ হোক আর নাই হোক, বিজেপি পশ্চিম বঙ্গ বাসীর চয়েজ। আমাদের দেশের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হবে সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আমাদের উপর।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৮ মে ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
বাংলাদেশে পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের মূল কারণ বিজেপির উত্থান। তবে আজ যারা বিজেপির বিরোধিতা করছে তারাই বিজেপির উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। মানুষ তো বটেই বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার নিরাপত্তা। আমাদের লেখাপড়া, চাকরি বাকরি, ক্যারিয়ার – সবই নিরাপত্তার জন্য। নিরাপত্তা কি? নিজের মত করে জীবন যাপনের গ্যারান্টি। ভালো, মন্দ, ঠিক, বেঠিক – সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা সে চায় নিজের মত করে, নিজের বিশ্বাস নিয়ে নির্বিঘ্নে দিন কাটাতে। তাই যখন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেভেন সিস্টার্স ও কোলকাতা দখলের হুমকি দেয় তখন সধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। সে নিরাপত্তা চায় সরকারের কাছে, সে চায় সরকার ভোটের হিসাব করে উগ্রবাদীদের সাথে ইঁদুর বিড়াল না খেলে তাদের পাশে দাঁড়াক, তাদের স্বার্থ রক্ষা করুক। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, পুড়িয়ে হত্যা তাদের ভীত করে। অন্য দিকে পশ্চিম বঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় পূজা করতে বাধা দেয়া সহ বিভিন্ন উগ্র সাম্প্রদায়িক তৎপরতা তাদের অসহায় বোধ করতে বাধ্য করে। আর অসহায় মানুষ যে তাকে একটু সান্ত্বনা দেয়, সাহস যোগায় তাকে বিশ্বাস করে বা করতে চায়। কী বাংলাদেশে, কী পশ্চিম বঙ্গে - সরকার জনগণের স্বার্থ, তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে খুব একটা ভেবেছে বলে মনে হয় না। তাদের একটাই লক্ষ্য – ক্ষমতা। আর তার ফলস্বরূপ মৌলবাদীদের তোষণ। এক্ষেত্রে বাম দলগুলোও খুব একটা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়নি। দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো মানেই ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো নয়। হায়েনা দুর্বল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায়ের বিরুদ্ধে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা প্রায়ই এই ভুলটি করি আর বাছবিচার না করে অপেক্ষাকৃত দুর্বল গোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াই যদিও সবল গোষ্ঠীর অনেক ব্যক্তি দুর্বল হতে পারে ও দুর্বল গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত হতে পারে। আর এসব কারণেই বিভিন্ন আশঙ্কা সত্ত্বেও মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – ভোট দিয়েছে যতটা না বিজেপির পক্ষে তারচেয়ে বেশি তৃণমূলের বিপক্ষে।
যদিও ১৯৪৭ সালের পর থেকে বিগত প্রায় ৮০ বছরে দুই বাংলা দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেছে; ভিন্ন তাদের পথ, ভিন্ন তাদের লক্ষ্য; তবে বিগত প্রায় পনেরো বছর তাদের রাজনৈতিক নদী একই খাতে প্রবাহিত হয়েছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ আর পশ্চিম বঙ্গে তৃণমূল – দুই দলই চেষ্টা করেছে নিজ নিজ দেশের বিরোধী দলকে ধূলায় মিশিয়ে দিতে। আর সেই সুযোগ নিয়ে মৌলবাদী শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসেছে।
মানুষের অন্যতম প্রধান দোষ হচ্ছে অন্যের সমালোচনা করা। অবশ্য তাকে অন্যতম প্রধান গুনও বলা যায়। কেননা যার সমালোচনা করা হয় সে যদি বিচক্ষণ হয় তবে নিজেকে শোধরাতে পারে, ভবিষ্যতে নিজেকে আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। ফলে পরনিন্দা, পরচর্চা দিনের শেষে পরোপকার হতে পারে। অন্য দিকে বিচক্ষণ মানুষ আত্মসমালোচনা করতেই বেশি পছন্দ করে। তাতে সে নিজের দোষত্রুটি সম্পর্কে সচেতন হয়। যে কেউ চাইলে এটাকে স্বার্থপরতা হিসেবে গণ্য করতে পারে। তবে মানুষের উপকার করার প্রবৃত্তি থেকেই হোক আর পরশ্রীকাতরতা থেকেই হোক – আমাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষ অন্যের সমালোচনা করেই সুখ পায়। নিজের সাফল্য যদি না থাকে তাহলে অন্যের ব্যর্থতায় খুশি হতে তারা মোটেও আপত্তি করে না। আর যদি অন্যেরা ব্যর্থ না হয় তাহলে তাদের ব্যর্থ হবার জন্য দোয়া বা প্রার্থনা করতেও কুন্ঠা বোধ করে না। এই তো সেদিন যখন রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর খবর এলো তখন এ নিয়ে উছ্বাসের পাশাপাশি কিছু কিছু স্ট্যাটাস দেখলাম আসন্ন বিপর্যয়ের কামনা করে। এতে লাভ? ঐ যে বলেছিলাম না আমাদের দেশে এসব মানায় না – নিজের এই ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণ করার জন্য হলেও বিপর্যয় দরকার। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ আরকি।
কী আমাদের দেশে, কী অন্য দেশে - জনগণ সবসময়ই রিসিভিং এন্ডে থাকে। ডান হোক আর বাম হোক - সবাই নিজেদের ব্যর্থতা জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিব্যি হাঁসের মত সাঁতার কেটে বেড়ায় নিজেদের তৈরি রাজনৈতিক ডোবায়। পশ্চিম বঙ্গের রাজ্যসভায় নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবি সেটা আবার প্রমাণ করল। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। হিলারি ক্লিন্টন পর্যন্ত নিজের পরাজয়ের দায় রাশিয়ার ঘাড়ে চাপিয়ে অনেক নাটক করেছিলেন আর সেটা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টায় আমেরিকা রাজকোষ থেকে মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। আগেই বলেছি বিজেপির ক্ষমতায় আরোহণে যারা মর্মাহত তারা যতটা না তৃণমূলের পতনে তারচেয়ে বেশি বিজেপির উত্থানে। কিন্তু অন্যান্য যেসব দল অল্টারনেটিভ হতে পারত সেই কংগ্রেস বা সিপিএমকে কিন্তু তৃণমূল নিজেই সমূলে উৎপাটন করেছে বা করার চেষ্টা করেছে ঠিক যেমন করেছিল আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের অপশাসনে কারণেই জনগণ তাদের ত্যাগ করেছে। যখন দুঃশাসন মানুষের গলায় ফাঁসের মত চেপে বসে সে তখন কে তাকে মুক্তি দিল সেটা নিয়ে ভাবে না, সে যে কারো বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে। পশ্চিম বঙ্গে সেই অর্থে কোন বিকল্প হাত ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে বিজেপি আর এ কারণেই জনগণ বিজেপির শরণাপন্ন হয়েছে। তাই যারা জনগণকে দোষারোপ করছে তারা ভুল করছে। কেন আমাদের দেশগুলোয় এমনকি সারা বিশ্বে ডানপন্থী শক্তির উত্থান হচ্ছে সেটা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। তবে এটা ঠিক যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শক্তি গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা করে না বলেই উগ্রপন্থীদের এই জয়জয়কার। সেই অর্থে গেল গেল বলে চিৎকার করার আগে নিজেদের ভুলত্রুটি শোধরাতে হবে। একদিকে আমরা নিজেদের দেশে চরম অরাজকতা কায়েম করব আর অন্য দেশে ন্যায়ের শাসন দাবি করব সেটা তো হয় না। আমরা চাই বা না চাই – বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি খোলামেলা, পরস্পরের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এক দেশে কিছু একটা ঘটলে তার প্রভাব পড়ে অন্য দেশের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে। যখন ইন্টারনেট ছিল না, অন্য দেশের সব কিছু ছিল চক্ষুর আড়ালে বা চোখে সেটাই পড়ত যা সেই দেশের সরকার বাইরে আসতে দিত – তখন ছিল ভিন্ন কথা। এখন মুহূর্তের মধ্যে ভালোমন্দ সবকিছু চোখের সামনে চলে আসে, সেটা মানুষকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করে। তাই পাশের দেশে সুস্থ পরিবেশ চাইলে নিজের দেশে আগে সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আশির দশকে বলা হত পারমাণবিক যুদ্ধে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে ধ্বংস করবে। ধ্বংস হবার ভয়ই তাদের সরাসরি যুদ্ধে না নামতে বাধ্য করেছিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের জায়গা নিয়েছে তথ্য। এই তথ্য এখন মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। সেটা যাতে না ঘটে সেজন্য দরকার সংযম, বিশেষ করে রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযত আচরণ। যতদিন না আমরা নিজেদের সংশোধন করতে পারব ততদিন বিভিন্ন দেশে শত্রুভাবাপন্ন সরকার গঠিত হবে। এটা মানুষের ইনস্টিংক্ট। জনগণ কোন তন্ত্র বোঝে না। সে চায় সুশাসন, কাজ ও জীবনের নিরাপত্তা। চায় কোন কিছু বিশ্বাস করা বা না করার স্বাধীনতা। যদি কোন সরকার সেটা নিশ্চিত করতে না পারে তবে মানুষ তার উপর আস্থা হারায়।
আমাদের লোকজন যতটা না নিজের দেশের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মাথা ঘামায় তারচেয়ে বেশি উত্তেজিত হয় আমেরিকা, ইন্ডিয়া এসব দেশের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে। এক্ষেত্রে ভ্লাদিমির পুতিন ও রাশিয়ার অবস্থান উল্লেখ করা যেতে পারে – “অন্য দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন করে সেই দেশের জনগণ নিজ নিজ বিবেচনা থেকে। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছুই নেই। তারা যাদের নির্বাচন করে তাদের নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। আর সেটা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নির্ভর করবে দুই পক্ষের উপর।” আমাদের মনে রাখতে হবে যে পশ্চিম বঙ্গ ভারতের একটি প্রদেশ। ভাষা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের খুব কাছের হলেও বিদেশ। সেদেশের বা সে প্রদেশের মানুষ নিজেদের জন্য সরকার নির্বাচন করবে। আমাদের কথা ভাবার অবকাশ বা দায়িত্ব তাদের নেই। তবে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ যে তাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে সেটাই স্বাভাবিক, যেমন সত্য উল্টোটাও। আমরা পুঁজিবাদী সমাজে বাস করি এবং পুঁজিবাদে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর যথেষ্ট অবদান আছে। তারপরেও ক্ষমতা লাভের পর প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল এখন সামন্তবাদী হয়ে ওঠে, যেনতেন প্রকারেণ ক্ষমতার চাবিকাঠি নিজেদের হাতে ধরে রাখতে চায়। মানুষ তখন আর নাগরিক থাকে না, ক্ষমতাসীনদের কাছে তারা হয় ক্রীতদাস। কিন্তু যে মানুষ একবার স্বাধীনতার স্বাদ পায় দুই দিন আগে হোক আর দুই দিন পরে হোক, সে বিদ্রোহ করে, সুযোগ খোঁজে নব্য জমিদারের হাত থেকে মুক্তি লাভের। কোথাও সেটা আসে গণ অভ্যুত্থানে কোথাও ভোটের বাক্সে। পছন্দ হোক আর নাই হোক, বিজেপি পশ্চিম বঙ্গ বাসীর চয়েজ। আমাদের দেশের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হবে সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আমাদের উপর।
বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৮ মে ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

Comments
Post a Comment