বিজন ভাবনা - (৪৮) শান্তির জন্য যুদ্ধ?
অনেক আগে থেকেই রাশিয়ায় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত, প্রচণ্ড গরম বা ঠাণ্ডা পড়ার কথা এসএমএস করে জানিয়ে দেয়া হয়। কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই ড্রোন আক্রমণের সম্ভাবনা জানিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিল কর্তৃপক্ষ। এসব সতর্কবার্তা আগে সাধারণত এয়ারপোর্টে জানানো হত। তবে ইদানিং কালে যাত্রীবাহী বাসে, ট্রেনে পরিকল্পিত ভাবে ইউক্রেনের ড্রোনের আঘাতের পরে সরকার সাধারণ মানুষকেও সতর্ক করে দিচ্ছে। গত কয়েক দিন হল অবশ্য নিয়মিত মস্কো ও আশেপাশে ড্রোন ভূপাতিত করার খবর দিচ্ছে। আগে সাধারণত এসব আক্রমণ হত রাতের বেলায়। এখন সারাদিনই প্রায় ৩০ টি করে ড্রোন ভূপাতিত করার খবর দিচ্ছে সরকার। এ থেকে বোঝা যায় পশ্চিমা বিশ্ব এখন ২৪/৭ সুত্রে রাশিয়াকে বিভিন্ন ভাবে আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে। এসব দেখে মনে হয় শান্তি সুদূর পরাহুত।
কয়েক দিন আগে পিতেরবুরগ ইকোনোমিক ফোরামে প্রেসিডেন্ট পুতিন বর্তমান কালের কিছু ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন মাত্র কয়েক দিন আগে এক রুশ ব্যবসায়ী তাঁকে জিলেনস্কির আমন্ত্রণে কিয়েভ যাওয়ার কথা জানান। তিনি আপত্তি করেননি। সেখান থেকে ফিরে সেই ব্যবসায়ী জানান জেলেনস্কি পুতিনের সাথে দেখা করতে চায়। প্রেসিডেন্ট পুতিন তাকে বলেন যে দেখা করার আগে দুই দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে সিরিয়াস আলোচনা দরকার, শুধু তার পরেই এই মিটিং সম্ভব। কিন্তু ঠিক পরের দিন ইউক্রেন একটি হোস্টেলে ড্রোন আক্রমণ চালিয়ে ১৪ থেকে ২২ বছর বয়সী ২১ জনকে হত্যা করে। এর পরে জেলেনস্কি এক খোলা চিঠিতে পুতিনকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে তাঁর বয়স, বিভিন্ন রিস্ক সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ফোরাম শুরুর দিন পিতেরবুরগে ড্রোন আক্রমণের কথাও বলে। পুতিনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত। তিনি যুদ্ধরত সেনাদের উদ্দেশ্যে বলেন, সারা দেশ তোমাদের দিকে চেয়ে আছে। কাজ করে যাও ভাইয়েরা। “কাজ করে যাও ভাইয়েরা” এটা রুশ বীর মাগোমেদ নুরবাগানদভের উক্তি। দাগেস্তানের এই নিরাপত্তা কর্মীকে মৌলবাদীরা অপহরণ করে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করে। কোন ভাবেই সেটা করতে না পেরে তারা অত্যাচার করে তাকে হত্যা করে। এর আগে তারা চেয়েছিল সে যেন সে যেন অনুশোচনা করে। কিন্তু নুরবাগানদভ সেটা না করে সবাইকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। মৌলবাদীদের ধ্বংস করার পর তাদের কাছে সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সমস্ত রাশিয়ায় তার এই কথা জনপ্রিয়তা লাভ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে রাশিয়ায় শতাধিক জাতির মানুষ বাস করে, রুশ সেই সব জাতির একটি। একই সাথে রুশ বলতে এরা তাকেই বোঝায় যে রাশিয়াকে ভালবাসে, রাশিয়ার উন্নয়নের জন্য কাজ করে। এদেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জন্য প্রাণ দেয়া, দেশের উন্নয়নে কাজ করা যেকোনো মানুষকেই সমান ভাবে সম্মান করা হয়। যাই হোক, “কাজ করে যাও ভাইয়েরা” পুতিনের এই উক্তি একটাই মাত্র বার্তা দেয় আর তা হল রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে এতটুকু পিছপা হবে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা করতে না পেরে ইউক্রেন এখন সন্ত্রাসবাদী কৌশল অবলম্বন করেছে। অনেক আগেই অবশ্য তারা সেটা করেছে। দারিয়া দুগিনা, ভ্লাদ তাতারস্কি সহ অনেককেই সন্ত্রাসী হামলায় হত্যা করেছে। তবে আগে সেটা ছিল জনপ্রিয় বা বহুল পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, মূলত পশিমা বিশ্বে রেসোন্যান্স তৈরি করার জন্য। বর্তমান আক্রমণ হচ্ছে এলপাথারি ভাবে জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে। এর পেছনে যে কম করে হলেও এমআই৬ এর হাত আছে সে বিষয়ে কারও কোন সন্দেহ নেই। এই সূত্র ধরেই ইউক্রেন গত ১০ জুন ঐতিহাসিক সেভাস্তোপোল প্রতিরক্ষা প্যানারমা মিউজিয়াম আক্রমণ করে। ১৮৫৪ - ১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় তুরস্ক, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিত বাহিনীর কয়েক গুণ বেশি নৌ-সেনার আক্রমণের বিরুদ্ধে রুশ নাবিকরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাকে চির স্মরণীয় করতে এই প্যানোরমা আঁকেন ফ্রানৎস রুবো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী এই প্যানারমা ধ্বংস করে। পরে তা নতুন করে গড়ে তোলা হয়। এখন হিটলারের অনুসারী (যা তারা শুধু স্বীকারই করে না, হিটলারের সহযোগী বান্দেরা ও অন্যদের রাষ্ট্রীয় ভাবে হিরোর মর্যাদা দিয়ে নিজেদের ফ্যাসিবাদের দোসর হওয়াকে সম্মানের মনে করে) ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন করে আঘাত হানল। ধারণা করা যায় যে এসব হয়েছে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। রাশিয়ার সাথে ব্রিটেনের বৈরিতা হাজার বছরের। ফ্রান্সেরও। যদিও এসব দেশের বিশেষ করে ব্রিটিনের রাজবংশ রুশ জারদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।
এর আগে কয়েকদিন ধরে ইউক্রেন জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র লক্ষ্য করে ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে। এমনকি মূল কেন্দ্রের কয়েক মিটার দূরে বোমা পড়েছে। যদিও এসব কেন্দ্র ধ্বংস করা যথেষ্ট কঠিন তবে ঘটনাপ্রবাহ সেদিকে যেতে পারে। আর বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হলে তার প্রভাব যে সমস্ত ইউরোপে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এসবই হচ্ছে ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণে। এটা অনেকটা জল্লাদের হাতে ছুরি তুলে দেওয়ার মত। মনে পড়ে যুদ্ধের প্রথম দিকের কথা। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে যখন জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মিসাইল আক্রমণ হয় তখন এ নিয়ে সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে যায়। দেশ ও কোলকাতা থেকে একাধিক মিডিয়া এ ব্যাপারে আমাকে ফোন করে। তবে যেহেতু আমি রাশিয়াকে ঢালাও ভাবে দায়ী করিনি, উল্টো বলেছি যে ঐ পরিস্থিতিতে হামলার পেছনে ইউক্রেনের হাত থাকাই স্বাভাবিক, তাই দ্রুত ওদের আগ্রহ কমতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আক্রমণ করে। ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এজেন্সি প্রধান রাফায়েল গ্রসি এসব হামলার নিন্দা করেন পারত পক্ষে কারা হামলা করছে অর্থাৎ ইউক্রেনের নাম না করেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইউরোপ ইউক্রেনের হাত দিয়ে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধরত। গণতন্ত্র, ইউক্রেনের জনগণের অধিকার এসব কথা বলে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও কতজন ইউক্রেনিয়ান এই যুদ্ধে মারা যাবে এ নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। তাদের দরকার মানুষ নয়, মাটি। আমরা উপনিবেশ যুগের কথা কি বেমালুম ভুলে গেছি? সেখানেও তারা উপনিবেশের সম্পদ নিয়েই আগ্রহী ছিল। জেলেনস্কির নিজেরও হারানোর কিছু নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য ইউরোপকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো। এতে কতজন রুশ আর কতজন ইউরোপিয়ান মারা যাবে তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। উল্লেখ্য যে তার আধ্যাত্মিক গুরু বান্দেরা ও অন্যরা একই রকম উৎসাহের সাথে রুশ, পোলিশ, ইহুদি ও অন্যদের গ্যাস চেম্বারে অথবা অন্যান্য ভাবে অত্যাচার করে হত্যা করত। সমস্যা হল মানুষ অভ্যাসের দাস। এমনকি যুদ্ধেও সে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যায়। সময় মত আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করতে না পারলে ধ্বংস নেমে আসে। ইতিহাস বারবার তার সাক্ষী ছিল। ইউরোপ কি সময় থাকতে তার আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ফিরে পাবে নাকি রাশিয়াকে ধ্বংসের নেশায় সে এতটাই মত্ত যে এধরনের বিপদ সে দেখতে পাবে না? শত্রুকে অবমূল্যায়ন করা, পিছু হটা বা শান্তির কোন রকম পথ খোলা না রেখে অন্ধ ভাবে আক্রমণের পথ বেছে নেওয়া ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তবে এসব নিয়ে ইউরোপে আপাতত ঐক্য নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে সহযোগিতা করে যারা হাজার হাজার রুশ, পোলিশ ও ইহুদিদের নির্মম ভাবে হত্যা করেছে তাদের জাতীয় বীর ঘোষণা ও দেহাবশেষ কিয়েভে সমাহিত করে ইউক্রেন সরকার নিজেদের ফ্যাসিস্টদের সাথে একাকার করে ফেলেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পোল্যান্ড এতদিন পর্যন্ত ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সহযোগী হলেও এখন তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ বান্দেরার প্রশ্ন পোলিশদের সেন্টিমেন্টকে আঘাত করে। তাছাড়া পোল্যান্ড এসব করে ইউক্রেনকে ভালবেসে নয়। এক সময় ইউক্রেন, বেলারুশ এসব দেশ পোল্যান্ডের অধীনে ছিল। রাশিয়া নয়, পোল্যান্ড হতে চেয়েছিল পূর্ব ইউরোপের প্রধান শক্তি। সেটা পারেনি রাশিয়ার কারণে, তাই রাশিয়ার প্রতি তাদের বিদ্বেষ জন্মগত। ধারণা করা যায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এমনকি ফ্যাসিস্টদের সাথে আতাত করতেও পশ্চিমা বিশ্বের আপত্তি করবে না। বরং ইউরোপ সর্বোত ভাবে চেষ্টা করছে ইউক্রেন যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে। তারা ২০২৯ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্ততঃ এ ধরণের কথা ইউরোপের নেতারা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে। তাদের ধারণা যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে রাশিয়ায় জন অসন্তোষ তত বাড়বে। অভিজ্ঞতা বলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে সেটা করতে হবে ভেতর থেকে, দেশের ভেতরে জন অসন্তোষ সৃষ্টির মাধ্যমে পঞ্চম বাহিনী তৈরি করে। এটা কতটুকু সম্ভব? যূদ্ধের শুরুতে তেল সহ বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বহির্বিশ্ব যুদ্ধের প্রভাব যতটা টের পেয়েছিল আমরা ততটা পাইনি। সেই সময় দেশ বিদেশ থেকে বন্ধুরা ফোন করে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানাত। আর আমরা বলতে গেলে কিছু টেরই পেতাম না। শুধু যাদের আঠারো ঊর্ধ্ব ছেলে সন্তান ছিল তাদের কেউ কেউ টেনশনে থাকত। তবে দ্রুত কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে আর্মিতে যথেষ্ট পরিমাণ যুবক যুদ্ধের জন্য নাম লেখাতে থাকলে সেই ভয় কমে আসে। বলতে গেলে দুটো সমান্তরাল সমাজ তৈরি হয়। একদল সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, আরেক দল শান্তিতে নিজেদের দৈনন্দিন জীবন যাপন করতে থাকে এমনকি যদি তারা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ইত্যাদি সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কাজে জড়িতও থাকে। মাঝেমধ্যে দু একটা ড্রোন বা রকেট রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হানলেও যুদ্ধক্ষেত্র ছিল দনবাস, ইউক্রেন ও ইউক্রেন সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশে। তবে ইদানিং কালে ইউক্রেন প্রায়ই রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন ও রকেট হামলা করছে। করছে মূলত বেসামরিক স্থাপনায়। তারা নিঃসন্দেহে চেষ্টা করছে সামরিক স্থাপনা টার্গেট করতে। তবে সেসব জায়গায় এন্টি এয়ার ডিফেন্স শক্তিশালী বলে ইচ্ছাকৃত ভাবে বেসামরিক স্থাপনায়ও আঘাত হানছে। এর মূল উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। যতদূর মনে হয় ইউরোপিয়ান দেশ ও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের এদিকেই ঠেলছে। এখন বাজারে যে কথাটা খুব চালু সেটা হল আগামী শরৎ ও শীতে যুদ্ধাবস্থার অবনতি ঘটবে। ইউরোপ ইতিমধ্যে প্রচুর ড্রোন তৈরি করে ইউক্রেনের হাতে তুলে দেবে, প্রয়োজনে নিজেরাও প্রক্সি যুদ্ধে নামতে পারে। তাই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয় সেটা বলা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যে ইউরোপ কী জনবলে, কী অর্থবলে রাশিয়ার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এখনও তারা সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে আছে। তবে তারা দ্রুত চেষ্টা করছে সেটা পুশিয়ে উঠতে। আর একবার সেটা হলে ইউরোপ ফিনল্যান্ড, বাল্টিক দেশ সমুহ ও পোল্যান্ডকে প্ররোচিত করবে যুদ্ধে নামার। সেক্ষেত্রে রাশিয়া যদি বাধ্য হয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে তাতে অবাক হবার কিছুই থাকবে না। বিশেষ করে সমাজে এখন সেই চাহিদা বাড়ছে। যুদ্ধ আজ সারা বিশ্বেই পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। দেখে মনে হয় ভালোই বিক্রি হচ্ছে। বিঃদ্রঃ লেখাটি ১২ জুন ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2026/06/12/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%aa%e0%a7%ae-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d/
কয়েক দিন আগে পিতেরবুরগ ইকোনোমিক ফোরামে প্রেসিডেন্ট পুতিন বর্তমান কালের কিছু ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন মাত্র কয়েক দিন আগে এক রুশ ব্যবসায়ী তাঁকে জিলেনস্কির আমন্ত্রণে কিয়েভ যাওয়ার কথা জানান। তিনি আপত্তি করেননি। সেখান থেকে ফিরে সেই ব্যবসায়ী জানান জেলেনস্কি পুতিনের সাথে দেখা করতে চায়। প্রেসিডেন্ট পুতিন তাকে বলেন যে দেখা করার আগে দুই দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে সিরিয়াস আলোচনা দরকার, শুধু তার পরেই এই মিটিং সম্ভব। কিন্তু ঠিক পরের দিন ইউক্রেন একটি হোস্টেলে ড্রোন আক্রমণ চালিয়ে ১৪ থেকে ২২ বছর বয়সী ২১ জনকে হত্যা করে। এর পরে জেলেনস্কি এক খোলা চিঠিতে পুতিনকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে তাঁর বয়স, বিভিন্ন রিস্ক সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ফোরাম শুরুর দিন পিতেরবুরগে ড্রোন আক্রমণের কথাও বলে। পুতিনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত। তিনি যুদ্ধরত সেনাদের উদ্দেশ্যে বলেন, সারা দেশ তোমাদের দিকে চেয়ে আছে। কাজ করে যাও ভাইয়েরা। “কাজ করে যাও ভাইয়েরা” এটা রুশ বীর মাগোমেদ নুরবাগানদভের উক্তি। দাগেস্তানের এই নিরাপত্তা কর্মীকে মৌলবাদীরা অপহরণ করে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করে। কোন ভাবেই সেটা করতে না পেরে তারা অত্যাচার করে তাকে হত্যা করে। এর আগে তারা চেয়েছিল সে যেন সে যেন অনুশোচনা করে। কিন্তু নুরবাগানদভ সেটা না করে সবাইকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। মৌলবাদীদের ধ্বংস করার পর তাদের কাছে সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সমস্ত রাশিয়ায় তার এই কথা জনপ্রিয়তা লাভ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে রাশিয়ায় শতাধিক জাতির মানুষ বাস করে, রুশ সেই সব জাতির একটি। একই সাথে রুশ বলতে এরা তাকেই বোঝায় যে রাশিয়াকে ভালবাসে, রাশিয়ার উন্নয়নের জন্য কাজ করে। এদেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জন্য প্রাণ দেয়া, দেশের উন্নয়নে কাজ করা যেকোনো মানুষকেই সমান ভাবে সম্মান করা হয়। যাই হোক, “কাজ করে যাও ভাইয়েরা” পুতিনের এই উক্তি একটাই মাত্র বার্তা দেয় আর তা হল রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে এতটুকু পিছপা হবে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা করতে না পেরে ইউক্রেন এখন সন্ত্রাসবাদী কৌশল অবলম্বন করেছে। অনেক আগেই অবশ্য তারা সেটা করেছে। দারিয়া দুগিনা, ভ্লাদ তাতারস্কি সহ অনেককেই সন্ত্রাসী হামলায় হত্যা করেছে। তবে আগে সেটা ছিল জনপ্রিয় বা বহুল পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে, মূলত পশিমা বিশ্বে রেসোন্যান্স তৈরি করার জন্য। বর্তমান আক্রমণ হচ্ছে এলপাথারি ভাবে জনগণের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিতে। এর পেছনে যে কম করে হলেও এমআই৬ এর হাত আছে সে বিষয়ে কারও কোন সন্দেহ নেই। এই সূত্র ধরেই ইউক্রেন গত ১০ জুন ঐতিহাসিক সেভাস্তোপোল প্রতিরক্ষা প্যানারমা মিউজিয়াম আক্রমণ করে। ১৮৫৪ - ১৮৫৫ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় তুরস্ক, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিত বাহিনীর কয়েক গুণ বেশি নৌ-সেনার আক্রমণের বিরুদ্ধে রুশ নাবিকরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাকে চির স্মরণীয় করতে এই প্যানোরমা আঁকেন ফ্রানৎস রুবো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনী এই প্যানারমা ধ্বংস করে। পরে তা নতুন করে গড়ে তোলা হয়। এখন হিটলারের অনুসারী (যা তারা শুধু স্বীকারই করে না, হিটলারের সহযোগী বান্দেরা ও অন্যদের রাষ্ট্রীয় ভাবে হিরোর মর্যাদা দিয়ে নিজেদের ফ্যাসিবাদের দোসর হওয়াকে সম্মানের মনে করে) ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন করে আঘাত হানল। ধারণা করা যায় যে এসব হয়েছে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। রাশিয়ার সাথে ব্রিটেনের বৈরিতা হাজার বছরের। ফ্রান্সেরও। যদিও এসব দেশের বিশেষ করে ব্রিটিনের রাজবংশ রুশ জারদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিল।
এর আগে কয়েকদিন ধরে ইউক্রেন জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র লক্ষ্য করে ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে। এমনকি মূল কেন্দ্রের কয়েক মিটার দূরে বোমা পড়েছে। যদিও এসব কেন্দ্র ধ্বংস করা যথেষ্ট কঠিন তবে ঘটনাপ্রবাহ সেদিকে যেতে পারে। আর বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হলে তার প্রভাব যে সমস্ত ইউরোপে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এসবই হচ্ছে ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণে। এটা অনেকটা জল্লাদের হাতে ছুরি তুলে দেওয়ার মত। মনে পড়ে যুদ্ধের প্রথম দিকের কথা। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে যখন জাপারোঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মিসাইল আক্রমণ হয় তখন এ নিয়ে সারা বিশ্বে হৈচৈ পড়ে যায়। দেশ ও কোলকাতা থেকে একাধিক মিডিয়া এ ব্যাপারে আমাকে ফোন করে। তবে যেহেতু আমি রাশিয়াকে ঢালাও ভাবে দায়ী করিনি, উল্টো বলেছি যে ঐ পরিস্থিতিতে হামলার পেছনে ইউক্রেনের হাত থাকাই স্বাভাবিক, তাই দ্রুত ওদের আগ্রহ কমতে শুরু করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আক্রমণ করে। ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এজেন্সি প্রধান রাফায়েল গ্রসি এসব হামলার নিন্দা করেন পারত পক্ষে কারা হামলা করছে অর্থাৎ ইউক্রেনের নাম না করেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইউরোপ ইউক্রেনের হাত দিয়ে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধরত। গণতন্ত্র, ইউক্রেনের জনগণের অধিকার এসব কথা বলে যুদ্ধ চালিয়ে গেলেও কতজন ইউক্রেনিয়ান এই যুদ্ধে মারা যাবে এ নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই। তাদের দরকার মানুষ নয়, মাটি। আমরা উপনিবেশ যুগের কথা কি বেমালুম ভুলে গেছি? সেখানেও তারা উপনিবেশের সম্পদ নিয়েই আগ্রহী ছিল। জেলেনস্কির নিজেরও হারানোর কিছু নেই। তার একমাত্র লক্ষ্য ইউরোপকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো। এতে কতজন রুশ আর কতজন ইউরোপিয়ান মারা যাবে তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই। উল্লেখ্য যে তার আধ্যাত্মিক গুরু বান্দেরা ও অন্যরা একই রকম উৎসাহের সাথে রুশ, পোলিশ, ইহুদি ও অন্যদের গ্যাস চেম্বারে অথবা অন্যান্য ভাবে অত্যাচার করে হত্যা করত। সমস্যা হল মানুষ অভ্যাসের দাস। এমনকি যুদ্ধেও সে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যায়। সময় মত আসন্ন বিপদ মোকাবেলা করতে না পারলে ধ্বংস নেমে আসে। ইতিহাস বারবার তার সাক্ষী ছিল। ইউরোপ কি সময় থাকতে তার আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি ফিরে পাবে নাকি রাশিয়াকে ধ্বংসের নেশায় সে এতটাই মত্ত যে এধরনের বিপদ সে দেখতে পাবে না? শত্রুকে অবমূল্যায়ন করা, পিছু হটা বা শান্তির কোন রকম পথ খোলা না রেখে অন্ধ ভাবে আক্রমণের পথ বেছে নেওয়া ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তবে এসব নিয়ে ইউরোপে আপাতত ঐক্য নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে সহযোগিতা করে যারা হাজার হাজার রুশ, পোলিশ ও ইহুদিদের নির্মম ভাবে হত্যা করেছে তাদের জাতীয় বীর ঘোষণা ও দেহাবশেষ কিয়েভে সমাহিত করে ইউক্রেন সরকার নিজেদের ফ্যাসিস্টদের সাথে একাকার করে ফেলেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পোল্যান্ড এতদিন পর্যন্ত ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান সহযোগী হলেও এখন তারা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ বান্দেরার প্রশ্ন পোলিশদের সেন্টিমেন্টকে আঘাত করে। তাছাড়া পোল্যান্ড এসব করে ইউক্রেনকে ভালবেসে নয়। এক সময় ইউক্রেন, বেলারুশ এসব দেশ পোল্যান্ডের অধীনে ছিল। রাশিয়া নয়, পোল্যান্ড হতে চেয়েছিল পূর্ব ইউরোপের প্রধান শক্তি। সেটা পারেনি রাশিয়ার কারণে, তাই রাশিয়ার প্রতি তাদের বিদ্বেষ জন্মগত। ধারণা করা যায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এমনকি ফ্যাসিস্টদের সাথে আতাত করতেও পশ্চিমা বিশ্বের আপত্তি করবে না। বরং ইউরোপ সর্বোত ভাবে চেষ্টা করছে ইউক্রেন যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে। তারা ২০২৯ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্ততঃ এ ধরণের কথা ইউরোপের নেতারা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে। তাদের ধারণা যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে রাশিয়ায় জন অসন্তোষ তত বাড়বে। অভিজ্ঞতা বলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে সেটা করতে হবে ভেতর থেকে, দেশের ভেতরে জন অসন্তোষ সৃষ্টির মাধ্যমে পঞ্চম বাহিনী তৈরি করে। এটা কতটুকু সম্ভব? যূদ্ধের শুরুতে তেল সহ বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বহির্বিশ্ব যুদ্ধের প্রভাব যতটা টের পেয়েছিল আমরা ততটা পাইনি। সেই সময় দেশ বিদেশ থেকে বন্ধুরা ফোন করে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানাত। আর আমরা বলতে গেলে কিছু টেরই পেতাম না। শুধু যাদের আঠারো ঊর্ধ্ব ছেলে সন্তান ছিল তাদের কেউ কেউ টেনশনে থাকত। তবে দ্রুত কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে আর্মিতে যথেষ্ট পরিমাণ যুবক যুদ্ধের জন্য নাম লেখাতে থাকলে সেই ভয় কমে আসে। বলতে গেলে দুটো সমান্তরাল সমাজ তৈরি হয়। একদল সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, আরেক দল শান্তিতে নিজেদের দৈনন্দিন জীবন যাপন করতে থাকে এমনকি যদি তারা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ইত্যাদি সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কাজে জড়িতও থাকে। মাঝেমধ্যে দু একটা ড্রোন বা রকেট রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হানলেও যুদ্ধক্ষেত্র ছিল দনবাস, ইউক্রেন ও ইউক্রেন সীমান্তবর্তী কয়েকটি প্রদেশে। তবে ইদানিং কালে ইউক্রেন প্রায়ই রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন ও রকেট হামলা করছে। করছে মূলত বেসামরিক স্থাপনায়। তারা নিঃসন্দেহে চেষ্টা করছে সামরিক স্থাপনা টার্গেট করতে। তবে সেসব জায়গায় এন্টি এয়ার ডিফেন্স শক্তিশালী বলে ইচ্ছাকৃত ভাবে বেসামরিক স্থাপনায়ও আঘাত হানছে। এর মূল উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। যতদূর মনে হয় ইউরোপিয়ান দেশ ও গোয়েন্দা সংস্থা তাদের এদিকেই ঠেলছে। এখন বাজারে যে কথাটা খুব চালু সেটা হল আগামী শরৎ ও শীতে যুদ্ধাবস্থার অবনতি ঘটবে। ইউরোপ ইতিমধ্যে প্রচুর ড্রোন তৈরি করে ইউক্রেনের হাতে তুলে দেবে, প্রয়োজনে নিজেরাও প্রক্সি যুদ্ধে নামতে পারে। তাই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয় সেটা বলা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যে ইউরোপ কী জনবলে, কী অর্থবলে রাশিয়ার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এখনও তারা সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে আছে। তবে তারা দ্রুত চেষ্টা করছে সেটা পুশিয়ে উঠতে। আর একবার সেটা হলে ইউরোপ ফিনল্যান্ড, বাল্টিক দেশ সমুহ ও পোল্যান্ডকে প্ররোচিত করবে যুদ্ধে নামার। সেক্ষেত্রে রাশিয়া যদি বাধ্য হয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে তাতে অবাক হবার কিছুই থাকবে না। বিশেষ করে সমাজে এখন সেই চাহিদা বাড়ছে। যুদ্ধ আজ সারা বিশ্বেই পাইকারি ও খুচরা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। দেখে মনে হয় ভালোই বিক্রি হচ্ছে। বিঃদ্রঃ লেখাটি ১২ জুন ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে
https://www.progotirjatree.com/2026/06/12/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%aa%e0%a7%ae-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d/

Comments
Post a Comment