বিজন ভাবনা - (৫২) যুদ্ধ যুদ্ধ এবং যুদ্ধ

বেশ কিছুদিন আগে লিখেছিলাম ইরান ইসরলাইল যুদ্ধ প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে যা রাশিয়া সহ অনেক দেশের যুদ্ধে সেই সব অস্ত্র ও কৌশল ব্যবহারের পথ সুগম করে দিয়েছে যারা আগে ন্যায় সঙ্গত কারণেই সমালোচিত হত। কি সেই সুবিধা?

বর্তমান যুদ্ধে কোন দেশই শত্রু দেশের নেতাদের উপর সরাসরি আঘাত হানে না। এসব আধুনিক যুদ্ধ নীতির পরিপন্থী বলে মনে করা হয়। আর এ জন্যেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাশিয়া জেলেনস্কির উপর আঘাত হানেনি, যেমন হানেনি জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট সাকাসভিলির উপর। আবার একই ভাবে চেচনিয়ার যুদ্ধে তারা দুদায়েভ, মাসখাদভ, বাসায়েভ সহ অনেক বিদ্রোহী নেতাদের বিনাশ করেছে। তাই জেলেনস্কি বা ইউক্রেনের অন্যান্য নেতাদের ধ্বংস করা টেকনিক্যালি এদের জন্য কোন সমস্যা ছিল না। তবে জেলেনস্কি, সাকাসভিলি এরা নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, দুদায়েভ ও অন্যরা সন্ত্রাসী। প্রশ্ন আসতে পারে আমেরিকা তো এর আগে সাদ্দাম ও গাদ্দাফিকে হত্যা করেছে, তাহলে নতুন করে জাস্টিফাই করার কি আছে? সাদ্দাম, গাদ্দাফি এরা নিহত হয়েছিলেন স্থানীয় জনতার হাতে, গণ আদালতের রায়ে। অনেকটা সেই পন্টি পিলটের মত। রোমের এই প্রতিনিধি যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার আদেশ দিলেও সেটা করেছিলেন গণ দাবির প্রেক্ষিতে। আর তাই বলতে পেরেছিলেন যে তিনি হাত ধুরে ফেলছেন, মানে যীশুর রক্ত তার হাতে লেগে নেই। আন্তর্জাতিক আইনে পূর্বের উদাহরণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইদানিং কালে বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় সন্ত্রাসী হামলার পরে রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জেলেনস্কিকে সন্ত্রাসী বলে ট্যাগ করছে। এই বাস্তবতা ও আমেরিকা ও ইসরাইল কর্তৃক ইরানের নেতাদের হত্যা রাশিয়ার এ ধরণের আক্রমণ করার পথ সহজ করে দেবে। এক্ষেত্রে মূল বাঁধা পুতিন নিজে। কারণ তিনি কিছু নীতিমালা মেনে চলেন, যার একটা প্রতিপক্ষকে হত্যা না করা আর শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের পাশে থাকা। তিনি বার বার এর প্রমাণ দিয়েছেন। তবে আমেরিকা ও ইসরাইলের ঘটনার পরে সমাজে চাপ বাড়ছে ইউক্রেনের বান্দেরা পন্থী নেতৃত্বের উপর এক হাত নেবার জন্য। তবে এটা যে শুধু পুতিনের খামখেয়ালী তা নাও হতে পারে। শোনা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে তখন হিটলারকে হত্যার এক প্ল্যান পেশ করে সামরিক কর্মকর্তারা। স্তালিন সেটা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, হিটলার সম্পর্কে সবাই সব জানে, তাই কোন নির্দিষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সে কি ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সেটা অনুমান করা যায়। কিন্তু তাকে হত্যা করা হলে কে সেই স্থান দখল করবে আর তার যুদ্ধনীতি কেমন হবে সেটা কেউ জানে না। তাই সেই মুহূর্তে হিটলারকে হত্যা করে সোভিয়েত নেতৃত্ব নিজেদের জন্য এক অজানা পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। জেলেনস্কি রাজনৈতিক ভাবে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ফিগার নয়। সে প্রথম থেকেই অন্যদের, খুব সম্ভব এমআই-৬ এর প্ল্যান বাস্তবায়ন করে। যেহেতু সে পেশাগত ভাবে অভিনেতা, তাই খুব সুন্দর ভাবে তাদের চাহিদা উপস্থাপন করতে পারে যা রাশিয়ার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। কিন্তু জেলেনস্কি সম্পর্কে এ দেশে সবাই সব জানে, জানে সেই নব্বুইয়ের দশক থেকেই যখন সে রাশিয়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করত। তার সাইকোটাইপ, তার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে পারে এসব কমবেশি মডেল করা যায়। তাই এই মুহূর্তে জেলেনস্কিকে সরানো রাশিয়ার জন্য ভালো কিছু হবে না। আর পশ্চিমা বিশ্বের কাছে যখন জেলেনস্কির প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে তখন তারা নিজেরাই ওকে সরিয়ে ফেলবে যাতে সে কোন গোপন কথা রাশিয়া বা অন্যদের কাছে ফাঁস করতে না পারে।

দ্বিতীয় যে ঘটনা উপসাগরীয় যুদ্ধকে অনন্য করেছে তা ইরানের বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশ আক্রমণ। এসব দেশে আমেরিকার যুদ্ধ ঘাঁটি থাকলেও তারা কেউ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। বরং সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছে নিজেদের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখতে। এমনকি আমেরিকা পর্যন্ত এই ধরণের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কারণ তৃতীয় কোন দেশে এমন আক্রমণ মূলতঃ তার বিরুদ্ধে বিনা উস্কানিতে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তবে ইরান ভয় পায়নি। যেহেতু উপসাগরীয় দেশগুলোয় আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আছে ও তা ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো মুহূর্তে ব্যবহৃত হতে পারে তাই তারা আগেই আঘাত হেনেছে। এটা একটা নতুন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এটা রাশিয়া বা অন্য যেকোন দেশের জন্য এক ধরণের উদাহরণ সৃষ্টি করে যেটার উল্লেখ করে পরবর্তীতে কোন দেশ এ ধরণের আক্রমণ চালাতে পারে, কারণ পশ্চিমা আইন এরকম উদাহরণ ভিত্তিক। ভ্লাদিমির পুতিন এক ইন্টার্ভিউতে এই ঘটনার উল্লেখ করেন। পারতপক্ষে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের নেতা ও জনগণকে জানিয়ে দেন যে যেহেতু এসব দেশ তাদের ভূমি, আকাশ সীমা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, এমনকি লক্ষ্য স্থির করতে ইউক্রেনকে সরাসরি সাহায্য করে তাই ইরানের উদাহরণ গ্রহণ করে রাশিয়া এদের যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে দেখবে এবং প্রয়োজনে ও সময় মত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ইতিমধ্যে কোন কোন ইউরোপীয় দেশ বিশেষ করে বাল্টিকের রাষ্ট্রসমূহ ও ফিনল্যান্ড এক সাথে রাশিয়ায় সহস্রাধিক ড্রোন আক্রমণের করা বলছে, এমনকি সেজন্যে ইউক্রেনকে নিজেদের আকাশ ব্যবহার করতে দিচ্ছে, তাই যদি রাশিয়া এক পর্যায়ে এদের আক্রমণ করে বসে তাতে অবাক হবার কিছু থাকবে না। এখন তাদের সমনে ইরানের উদাহরণ আছে। অনেকের বিশ্বাস কোন হেলসিঙ্কি, বার্লিন, প্যারিস, ওয়ারশ বা লন্ডন বাঁচাতে আমেরিকা নিউ ইয়র্ক বা অন্য কোন আমেরিকান শহর বিপদের মুখে ফেলবে না।

এর পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ আরও একটি দিক উন্মোচন করেছে। শত্রুর চেয়ে সামরিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিকে কয়েক গুণ দুর্বল হবার পরেও দেশ রক্ষার জন্য জনগণের ঐক্য যেকোনো শক্তিকে রুখে দিতে পারে। এমনকি যদি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক বোমাও ব্যবহার করা হয়, সামরিক ভাবে জয়লাভ করলেও নৈতিক ভাবে আমেরিকা ও ইসরাইল পরাজিত হবে। এখনও পর্যন্ত ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতির মূলে ছিল ইহুদিদের হলকস্ট, জার্মানির ইহুদি নিধন। কিন্তু প্যালেস্টাইনের অধিকার ক্রমাগত ক্ষুন্ন করে ইসরাইল তার নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার বহির্বিশ্বে তার শেষ সমর্থন পর্যন্ত উঠিয়ে নেবে। তাই যেকোনো দেশ আক্রমণ করার আগে ভাবতে হবে যুদ্ধের ময়দানে জয় শেষ কথা নয়। যদিও বর্তমানে ড্রোন নিয়ে অনেক কথা বলা হচ্ছে, বলা হচ্ছে যে কামান ট্যাঙ্কের যুগ শেষ, এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট সব যুদ্ধের ফয়সালা করবে, ইরান ও রুশ যুদ্ধ প্রমাণ করে প্রমাণ করে যে এখনও মানুষের দেশপ্রেম যুদ্ধের জয় পরাজয় নির্ধারণ করে। আসলে ইতিহাসে বার বার এটাই প্রমানিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া জার্মানির চেয়ে কী সামরিক, কী অর্থনৈতিক – সব দিক থেকে অনেক দুর্বল ছিল, তারপরেও রুশ জনগণ দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ করেছিল, বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। একাত্তরে বাংলাদেশের মানুষও দেশপ্রেমের জোরেই পাকবাহিনীকে পরাজিত করেছিল। তাছাড়া রকেট, ড্রোন, বিমান এসব দিয়ে শহর, স্থাপনা, মানুষ ধ্বংস করা যায়, কিন্তু গড়তে হলে দরকার সেই সৈনিক, যারা শুধু ভূমি উদ্ধার করবে না, সেখানে গড়ে তুলবে নতুন জনপদ।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তুরস্কে ন্যাটোর সামিটে জেলেনস্কি খুব বেশি কিছু পায়নি। বরং তুরস্কে অবস্থান কালে ইউক্রেন পাইপ লাইন আক্রমণ করেছে যা দিয়ে রাশিয়া থেকে তুরস্কে তেল ও গ্যাস যায়। এর আগে হিটলারের দোসরদের নামে বিভিন্ন ব্যাটেলিয়নের নাম রাখা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খুনীদের ইউক্রেনের মাটিতে পুনরায় সমাহিত করায় ইউরোপে ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা নিঃসন্দেহে ইউক্রেনের রুশ হত্যাকে স্বাগত জানায়, কিন্তু যখন পোলিশ, জু ও অন্যদের প্রশ্ন আসে, তখন তারা ইউক্রেনের কাছ থেকে বান্দেরাকে হিরো বানানোর পরিবর্তে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুশোচনা আশা করে।

ইউক্রেনের বেসামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার উত্তরে রাশিয়া প্রতিদিন এক এক করে ইউক্রেনের বিভিন্ন কলকারখানা, পেট্রোল পাম্প ইত্যাদি ধ্বংস করছে। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার দেয়া গোলা বারুদের গুদামে আঘাত করেছে। কিয়েভের উপকণ্ঠে এই এলাকা থেকে লোকজন সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ধারণা করা হয় এখানে ডার্টি বোমা মানে স্বল্প তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম ছিল। রাশিয়া অনেক আগে থেকেই এসব বলেছিল, এখন ইউক্রেন নিজেই নিজের বোকামির শিকার হচ্ছে। এমনিতে তো আর বলে হয় না আমেরিকার সাথে শত্রুতা করা বিপদজনক, কিন্তু তার সাথে বন্ধুত্ব করা মারাত্মক।

বিঃদ্রঃ লেখটি ১০ জুলাআই ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

বিজন ভাবনা (৫২): যুদ্ধ যুদ্ধ এবং যুদ্ধ   -বিজন সাহা https://share.google/TaWmfbrBAVXdQliXQ  

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (৪৭) যাত্রী একই তরণীর

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট