বিজন ভাবনা - (৫৫) চব্বিশের মীরজাফর

যখন লেখাটা বেরুবে তখন ছাব্বিশের জুলাই অস্তমিত হবার পথে। দুই বছর আগেও জুলাই ছিল অতি সাধারণ একটি মাস। তার না ছিল ফেব্রুয়ারি, মার্চ বা ডিসেম্বরের মত গৌরবময় ইতিহাস, না ছিল আগস্টের ভয়াবহ শোক। কিন্তু ২০২৪ সালে সে সবকিছু ছাড়িয়ে যাবে। পরে কেউ একে বলবে “জুলাই বিপ্লব”, কেউ “জুলাইয়ের গণ অভ্যুত্থান”, কেউ বা “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”। দেশে একটা কথা আছে

- বৃক্ষ তোমার নাম কি?
- ফলে পরিচয়।
ফলেই যদি পরিচয় হয় তবে এখন একে নিঃসন্দেহে “ভন্ড জুলাই” বলা যায়। কারণ জুলাইয়ের নটনটীরা বাংলাদেশ ও দেশের আপামর জনসাধারণকে যেভাবে ধাপ্পা দিয়েছে, যেভাবে ঠকিয়েছে সেভাবে আর কেউ করেনি। সমস্যা হল যে এই সত্যটি এখনও সবাই উপলব্ধি করতে পারছে না, আবার পারলেও অনেকেই স্বীকার করতে সাহস পাচ্ছে না। উদ্দেশ্য যতই ভালো হোক যদি ফল খারাপ হয় তাহলে সেটার দায় এড়ানো যায় না।

তারপরেও অনেকেই এখনও স্বৈরাচার তাড়ানোর আনন্দে মৌলবাদের উত্থান দেখতে পাচ্ছে না। ভুল করা সহজ কিন্তু ভুল স্বীকার করা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সঠিক হলেও তার বাস্তবায়ন অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর কারণ স্বৈরাচারের পতন চরম লক্ষ্য হতে পারে না, এটা বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের প্রথম ধাপ মাত্র। যদিও শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দুই বছর কেটে গেছে তবুও দেশে আইনের শাসন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র এসব কিছুই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং দেশের অর্থনীতি, আইন শৃঙ্খলা, বাকস্বাধীনতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নাগরিক নিরাপত্তা সহ সমস্ত ক্ষেত্রেই পরিস্থিতির অবনতিতে অতীতের যেকোনো সময়ের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তারপরেও অনেকেই শুধু মাত্র অন্ধ আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধিতা থেকে এসব নিয়ে মুখ খুলতে চাইছে না, বরং স্বৈরাচারের হাত থেকে দেশ মুক্ত করেছে সেই আনন্দেই এখনও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে।

নিজের ভুল স্বীকার করার জন্য যে সৎ সাহস দরকার আমাদের রাজনীতি থেকে তা কর্পূরের মত উবে গেছে। ভুল স্বীকার করা যে দুর্বলতা নয়, উল্টো একটি সাহসী পদক্ষেপ সেটা আমরা প্রায়ই অনুধাবন করতে পারি না। কেন? এটা আমাদের শিক্ষা - পারিবারিক ও সামাজিক। ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরাজয়কে লজ্জাজনক বলে শেখানো হয়। ছোট হব না, মাথা নীচু করব না - এটাই মূল কথা। ছোট হয়ে মানে বিনয়ী হয়েও যে বিজয়ী হওয়া যায় সেটা আমরা মানতে রাজি নই।

আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি। কিন্তু ভারত বিভাগই তো হয়েছিল গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। যেহেতু ভারতে মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যালঘু ও গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কম তাই মুসলিম লীগ নিজস্ব দেশ দাবি করেছিল। এটা ছিল গণতন্ত্রের পিঠে প্রথম ছুরিকাঘাত।

দ্বিজাতিতত্ত্বকে পরিত্যাগ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা তলে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের আবির্ভাব। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হলেও এদেশের মানুষের একটি বড় অংশ দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি পায়নি। সেই তত্ত্বের একটি বিবর্তিত রূপ এদেশের রাজনীতিতে সব সময়ই বিরাজমান ছিল। হিন্দু ও মুসলমানের জায়গা দখল করে সরকারি ও বিরোধী দল। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এর অর্থ দাঁড়ায় ভিন্ন মতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা।

বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার সেটাই প্রমাণ করেছে। আর এ কারণেই কোন বিরোধী দলই ক্ষমতাসীনদের শাসন মেনে নেয়নি। এটাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম প্রধান বাধা। না বিরোধী দল, না শাসক দল, কেউই কখনও রাজনীতিতে একে অন্যকে পরিপূরক হিসেবে দেখেনি, শুধু শত্রু হিসেবেই দেখেছে। ফলে শুধু নির্বাচনের মাঠেই নয়, সবসময়ই সেই শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কাজ করে গেছে। এর ফলে তারা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকেই ধ্বংস করেনি, ধ্বংস করেছে রাজনৈতিক পরিবেশ, ধ্বংস করেছে দেশ – কারণ দেশ শুধু মাটি আর মানুষ নয়, সবার উপর দেশ তার সংবিধান, তার পথ চলার নিয়মাবলী। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই এখানে আইন পদদলিত হয়েছে, রাষ্ট্র হয়েছে রাজ্য, যেখানে সংবিধান নয় রাজার ইচ্ছায়ই সব চলে। এই রাজা কখনও ছিল ব্যক্তি, কখনও গোষ্ঠী। তাই চব্বিশের পর যা কিছু আমরা দেখি তার পূর্বশর্ত তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। সেই পরিস্থিতিকে ব্যবহার করেই অন্যরা দ্রুত গতিতে পেছন হাঁটতে শুরু করেছে।

রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শাস্তি দেওয়ার মনোপলি। ন্যায়, অন্যায় নির্ধারণ ও অপরাধীকে শাস্তি দেবার আইনগত অধিকার আছে একমাত্র রাষ্ট্রের। কিন্তু ২০২৪ এর জুলাই আগস্টে নির্বিচারে পুলিশ হত্যা করে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে বিচার ব্যবস্থা। শাস্তি দেবার অধিকার চলে গেছে মবের হাতে। এটা আমাকে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার (বিএলএম) আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। জর্জ ফ্লইডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের কর্মীরা মূলত আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের বাধ্য করে তাদের পূর্বপুরুষদের বর্ণবাদী আচরণের জন্যে তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেলার মাঠ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় হাঁটু গেঁড়ে বসে প্রায়শ্চিত্ত করার ট্র্যাডিশন তৈরি হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনে কোন যুক্তি নয়, মবের কথাই ছিল আইন।

জানি না বাংলাদেশের মবকারীদের কেউ আমেরিকা থেকে প্র্যাক্টিক্যাল করে এসেছিল কিনা, তবে আমেরিকার অভিজ্ঞতা যে এখানে কাজে লাগানো হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। এই মবের দাপটে ইতিমধ্যে নতজানু প্রায় বিচার ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হয়েছিল। আর এটা করা হয়েছিল কিছু কিছু লোকের সুবিধার জন্য।

বলা হয়ে থাকে যে বাচ্চাদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হয় অল্প বয়স থেকেই। ছোটবেলা থেকেই যদি তাদের অন্যায়কে যেকোনো অজুহাতে প্রশ্রয় দেয়া হয় তবে এক সময় তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাসিনা সরকার পতনের পর মব, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, বত্রিশ নম্বর ভাঙ্গা, গণভবন লুট ইত্যাদি আইন শৃঙ্খলা বিরোধী সমস্ত অপরাধের সমালোচনা না করে, সেসব দমনের চেষ্টা না করে বরং এসব স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জমে থাকা আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এভাবেই একটা প্রজন্মকে যা খুশি করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

২০২৪ এর জুলাই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর পর্যালোচনা করলে যে কথাটা প্রথমেই মনে আসে তা হল – ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা।’ বিশেষ করে কথিত বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন সবাই এই দোষে দোষী। সরকার পড়লে যে শূন্যতা তৈরি হবে সেটা যে সেই সময়ের, এমনকি বর্তমানেরও সাংগঠনিক ভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দল জামায়াত শিবিরের দ্বারা পূর্ণ হবে এটা না বোঝার কোন কারণ ছিল না। আর যদি না বোঝে তাহলে তাদের রাজনীতি করা উচিৎ নয়।

শেখ হাসিনাকে যেকোনো মূল্যেই ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে, এটাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ফলাফল যা হবার, তাই হয়েছে। যে একাত্তর, যে স্বাধীনতা ছিল তাদের একমাত্র গর্বের জায়গা, সেটা তারা নিজের হাতে বিসর্জন দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধিতা তাদের শক্তিশালী করেনি, শুধু জামায়াত শিবিরের হাতকেই শক্তিশালী করেছে। সেটা বিভিন্ন বাম দলের বা দলের ভেতর ঘাপ্টি মেরে লুকিয়ে থাকা শিবির ক্যাডারদের মেটিকুলাস প্ল্যান কিনা তা ভবিষ্যৎ বলবে।

যারা স্বাধীনতা বিরোধী, যারা এখনও নিজেদের পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে, তারা দেশের জন্য ততটা ক্ষতিকর নয়, যতটা ক্ষতিকর সেই সব লোকজন, যারা নিজেদের প্রগতিশীল, একাত্তরের সঠিক চেতনার ধারক ও বাহক মনে করে বা সেভাবেই নিজের পরিচয় দেয়, কিন্তু এখনও স্বৈরাচারী কার্ড খেলে অশুভ মৌলবাদী শক্তিকে পরাজিত করার বলতে গেলে একমাত্র সম্ভাবনা, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার বিরোধিতা করে।

সিপিবির প্রধান শক্তি ছিল একাত্তরের প্রতি তার অঙ্গীকার। যদি ধরেই নেই যে আওয়ামী লীগের চেতনা বানিজ্য তাকে বাধ্য করেছিল যে করেই হোক হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে কিন্তু পরবর্তীতে ঐক্যমত কমিশনে বাহাত্তরের সংবিধান প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, জুলাই না একাত্তর - এই ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা, একাত্তরের সব রকম চিহ্ন মুছে দেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করা, এসব রাজনীতিতে তাদের অবস্থানকে লেজেগোবরে করে ফেলে। একাত্তরের সমর্থকদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে অন্যদিকে চব্বিশের সমস্ত অর্জন স্বাধীনতা বিরোধীদের দ্বারা হাইজ্যাক হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে তার প্রভাব সিপিবিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলার পর্যায়ে নিয়ে আসে। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন বেঁচে আছে তার গুণগ্রাহীদের স্মৃতিতে অদূর ভবিষ্যতে সিপিবির অবস্থা এমনটা হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। কোন কোন বাম নেতা শেষ পর্যন্ত এই অমোঘ সত্যটি উপলব্ধি করে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বামদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছে বলে ফেসবুকে খবর বেরিয়েছে। সমস্যা হল সময়ের কাজ সময়ে না করলে পরে পস্তাতে হয়। এ ব্যাপারে লেনিন তাঁর বিখ্যাত এপ্রিল থিসিসে আমাদের সতর্ক করে গেছেন।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি চব্বিশ ও একাত্তরকে এমনভাবে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে যে “একাত্তর আর চব্বিশ পরস্পরের পরিপূরক” বামদের এই স্লোগান আর ধোপে টেকে না। ফলে তেলে জলে এক করার বর্তমান প্রচেষ্টা তাদের রাজনৈতিক ভাবে ক্লীব করবে। অন্য দিকে চব্বিশের পক্ষ গ্রহণ করলে স্বাধীনতার পক্ষের কাছে তারা মীরজাফর হিসেবে পরিচিত হবে, চব্বিশকে সম্পূর্ণ ভাবে পরিত্যাগ করলে “দ্বিতীয় স্বাধীনতার” কলাকুশলীদের কাছে তারা হবে মীরজাফর। এটাই হবে তাদের রাজনৈতিক ধূর্তামির যোগ্য পরিণতি।

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জয়লাভ করে প্রায় দুশ বছর অবিভক্ত ভারত শাসন ও এদেশ থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্রিটেনে পাচার করলেও মীরজাফরকেই বিশ্বাসঘাতক ও কালপ্রিট হিসেবে গণ্য করা হয়। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনে অনেকেই যুক্ত থাকলেও এবং অনেক বেশী সুবিধা ভোগ করলেও খোন্দকার মোশতাক আহমদ সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত। সময় থাকতে ২০২৪-এর আন্দোলনে নিজেদের ভুল স্বীকার করে আওয়ামী লীগ, বিএনপি সহ সব দলের দেশপ্রেমিক ও একাত্তর পন্থী জনতার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই না করলে একদিন বামেরাই চব্বিশের মীরজাফর বলে পরিচিত হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ৩১ জুলাই ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

বিজন ভাবনা(৫৫): চব্বিশের মীরজাফর   -বিজন সাহা https://share.google/N0QlASEqaeFSgzO5O

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (১১) সিপিবির কংগ্রেস ও কিছু কথা

বিজন ভাবনা - (৪৭) যাত্রী একই তরণীর

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট