বিজন ভাবনা - (৬০) দুই পারসেন্ট

গত বছর অক্টোবরের দিকে ঋভূ মেসেজ পাঠাল
- অভিনন্দন স্যার!
ঋভূ পশ্চিম বঙ্গের ছেলে। মিফি মানে মস্কো ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে মাস্টার্স করে দুবনায় কাজ করছে। আমার সাথে আলাপ বছর দুয়েক আগে। এখন মাঝে মধ্যে যোগাযোগ হয়। যাহোক, হঠাৎ অভিনন্দনের খবরে একটু অবাকই হলাম। এরকম কিছু ঘটলে মনে প্রথমেই যে প্রশ্ন জাগে তা হল “আমি আবার কী দোষ করলাম?”
- হঠাৎ? কী হল আবার?
- না, মানে জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (জেআইএনআর) টেলিগ্রাম চ্যানেলে অনেক নামকরা বিজ্ঞানীর সাথে আপনার নাম দেখে খুব ভালো লাগল তাই।
- তাই নাকি?
- আপনি জানতেন না?
- কই, না তো!
- আমি আপনাকে নিউজটা পাঠাচ্ছি।
- ওকে, পাঠিয়ে দিও।
ঋভূ আমাকে ঐ নিউজটার একটা কপি পাঠাল। তাতে দেখলাম আমাদের ইনস্টিটিউট থেকে ৩০ জন বিজ্ঞানী বিশ্বের সেরা ২% বিজ্ঞানীর লিস্টে স্থান পেয়েছে। আমার ল্যাব থেকে আমরা দুই জন।

বিকালে যখন ক্লাবে গেলাম, ওলগা বলল
- তোমার নাম দেখালাম জেআইএনআরের প্রথম দিকের বিজ্ঞানীদের লিস্টে।
- তাই?
পরের দিন সুপার মারকেটে ইউলিয়ানের সাথে দেখা। ওর সাথে আলাপ ফটোক্লাব অব্রাজে।
- বিজন, তুমি তো কখনও বলনি যে এত ভাল কাজ করছ।
- হঠাৎ এই প্রশ্ন?
- পত্রিকায় তোমার নাম দেখলাম।
দুবনার অনেক লোকজন আমাকে ফটোগ্রাফার হিসেবে চেনে, অনেকেই প্রশ্ন করে কবে আমার ফটো এক্সিবিশন। এই প্রথম মনে হয় অনেকেই জানল আমি শুধু ছবিই তুলি না, গবেষণাও করি। আরও কয়েকজনের মুখে একই কথা শুনে নিজেরই ইচ্ছা হল ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার। মনে পড়ল বছর দুই আগে আমাদের গ্রুপের হেড সাশা আমাকে বলেছিল ২% এ আমার নাম থাকার কথা। তবে এ নিয়ে তেমন আগ্রহ জাগেনি মনে। কারণ এক সময় মিখাইল কাসিয়ানভ বলে রাশিয়ার এক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সাংবাদিকরা তাকে মিঃ ২% নামে ডাকত তিনি ঐ পরিমাণ কমিশন নিতেন বলে। তাই ২% এর প্রতি এক ধরণের এলার্জি ছিল। তাছাড়া আমার সবসময় মনে হয়েছে আমি কাজ করি কাজ করার আনন্দে তাই এসব পারসেন্ট নিয়ে কখনই মাথা ঘামাইনি। মনে পড়ল ফেসবুকে মাঝেমধ্যে এরকম খবর দেখেছি – অমুক বা তমুক বিশ্বের ২% বিজ্ঞানীর লিস্টে যুক্ত হয়েছেন। আমার বিদেশী কলিগদের কেউ কেউ এই লিস্টে স্থান পেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে। কিন্তু আমি ঠিক কখনোই খুঁজে পাইনি যে কীভাবে এই লিস্ট তৈরি হয়। কারণ বিজ্ঞান তো প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, সবাই নিজের নিজের ক্ষেত্রে কাজ করেন। কোন কোন ক্ষেত্রে অনেক লোক কাজ করে বা বলা যায় কোন কোন ক্ষেত্র ফ্যাশনেবল তাই সেখানে কাজ করলে বেশি গবেষক দ্বারা রেফারড হবার সম্ভাবনা বেশি। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে হাতে গণা কিছু লোক কাজ করে, এই ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম পেপার বের হয় তাই সেখানে রেফারড হবার পরিমাণ কম। যাহোক, ঋভূর মেসেজটা পাবার পর একটু আগ্রহ জাগল ব্যাপাটা কি জানার জন্য। কিন্তু কীভাবে জানা? এর মধ্যে এক বন্ধুর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখলাম – আবারও ২% এ অন্তর্ভুক্ত হবার খবর জানিয়ে। এতে একটা কাজের কাজ হল। কোন সাইটে এসব খবর পাওয়া যাবে সেটা জানা গেল। তারপর? কিছু কিছু ক্ষেত্রে না জানার চেয়ে জানাটা বেশি বিড়ম্বনার। কারণ বর্তমান রাশিয়ায় অধিকাংশ সাইট ওপেন হয় না। ফলে এসব ইনফরমেশন অনেকটা দোকানের শেলফে রাখা মিষ্টির মত - যা কেনার সামর্থ্য তোমার নেই, এমনকি দেখে যে মন ভরাবে সে উপায়ও নেই, কারণ পানতোয়া লেখা প্লেটটি কাপড় দিয়ে ঢাকা। যাহোক বিদেশে বন্ধুরা থাকে, তাই ওদের মাধ্যমে খবর নিলাম, জানলাম ২০২০ থেকে প্রতিবারই আমার নাম ওই লিস্টে আছে। তবে এটা ভাল না মন্দ সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, কারণ কোন আইডিয়া নেই সেটা দিয়ে কী করব। কিন্তু ওই সময় একটি ঘটনা ঘটল। আমাদের ফ্যাকাল্টির ৬৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অনেক পুরানো বন্ধুদের সাথে দেখা হল। কথায় কথায় ওদের এটা জানাতে সবাই বলল, তাক দেরঝিস, মানে এভাবেই চালিয়ে যাও। এর অর্থ দাঁড়ালো পছন্দ হোক আর না হোক তোমাকে এই লিস্টে থাকার জন্য চেষ্টা করতে হবে। মহা ঝামেলা। তবে কয়েক দিন পর এর একটা উপকারিতা বুঝলাম। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমার কাজের মেয়াদ শেষ। ২০১০ সাল থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর আমাকে চাকরি রিনিউ করতে হয়। রাশিয়ায় এখন স্থায়ী চাকরি বলতে কিছু নেই, সবাইকে একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এটা মূলত ফর্মাল, তবে সেজন্য গত টার্মের (আমার জন্য পাঁচ বছরের) কাজ কর্মের একটি হিসাব পেশ করতে হয়। তাই ব্যাপারটা অটোমেটিক্যালি হয় না। তবে আমার জন্য সমস্যা কাজ মানে পাবলিকেশন নয়, সমস্যা কাজের থিম। ১৯৯৪ সালে আমি জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চে যোগ দেই। প্রথম পাঁচ বছর কাজ করি থিওরেটিক্যাল ল্যাবে, কনডেন্সড ম্যাটার গ্রুপে। ১৯৯৯ সালে থেকে ল্যাবরেটরি অফ ইনফরমেশন টেকনোলজিতে। কিন্তু আমি কাজ করি কসমলজির উপরে। এর অর্থ ফরমালি আমি কাজ করি না, অকাজ করি। পাবলিকেশন, কনফারেন্স, সেমিনার এসবে নিয়মিত অংশ নেই, কারো সাতে পাঁচে নেই। বেতন বাড়ানোর জন্য বলি না। এসব ঠিক। তবে সুযোগ পেলেই বলে তুমি কিন্তু আমাদের জন্য মানে আমাদের ল্যাবের জন্য কিছু করছ না। এটা অনেকটা পাহারাদারের মত। সে পয়সার বিনিময়ে পাহারা দেয়, কিন্তু আসলে সে ঘুমায়। তবে সে স্বপ্নে আভাস পেয়ে মালিকদের বিপদের হাত থেকে বাঁচায়। মালিক সে জন্য কৃতজ্ঞ, কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে তার কি করা উচিৎ, চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করার জন্য চাকরি থেকে পত্রপাঠ বিদায় করা উচিৎ নাকি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ চাকরির মেয়াদ বাড়ানো উচিৎ। তাই প্রতিবার রিনিউয়ালের সময় একটু টেনশনে থাকি। এবারও যখন আকসানা ডেকে জিজ্ঞেস করল, “ডিসেম্বরে আপনার চাকরির মেয়াদ শেষ। আপনি আমাদের ল্যাবে কাজ করবেন নাকি অন্য কোথাও চলে যাবেন? যদি এখানে কাজ করতে চান এই এই ডকুমেন্টগুলো জমা দিতে হবে।”

ব্যক্তিগত ভাবে এই প্রথম আমার বিগত পাঁচ বছরের কাজে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। এর বিভিন্ন অব্জেক্টিভ কারণ ছিল। যেমন ২০২০ সালের রিনিউয়ালের পরেই আমি করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছিলাম। এরপরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেটা কাজকর্মের ফ্লো কমিয়ে দেয়। এর আগে আমি মূলত গবেষণা করতাম, বিগত সময়ে পাশাপাশি শিক্ষকতা করি, ফলে ছাত্রদের পেছনে বেশ সময় দিতে হয়। আমার পাবলিকেশনের ৯৫% বিদেশি জার্নালে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কোন রকম কারণ না দেখিয়েই বিভিন্ন পত্রিকা আমার ম্যানুস্ক্রিপ্ট ফিরিয়ে দিতে শুরু করে। এমনকি যেসব জার্নালে আমার ৮-১০ টা করে পেপার রয়েছে, তারাও বলে এই বিষয়ে আমরা পেপার পাবলিস করি না। এসব কারণে পাবলিকেশনের সংখ্যা অন্যান্য সময়ের প্রায় অর্ধেক। সেদিক থেকে ওই লিস্টে নাম থাকায় মনোবল একটু বেড়েছিল সেটা অস্বীকার করব না। তাই আমার বায়োগ্রাফিতে ২০২০ সাল থেকে ২% লিস্টের উল্লেখ করলাম। আর কাউন্সিলের আগে বিগত সময়ে কাজের উপর যে রিপোর্ট করতে হয় সেমিনারে, সেখানেও একথা উল্লেখ করলাম। ওটা ওরা আমলে নিয়েছিল কিনা জানি না, তবে বরাবরের মতই স্মুথলি রিনিউ হয়েছিল। বরং এবার আরও ভালো হয়েছিল। প্রতিবারই আমার বিরুদ্ধে একটা ভোট পড়ত। হ্যাঁ, নির্বাচন হয় গোপন ব্যালটে। এবারে বিপক্ষে কোন ভোট পড়েনি। আমি তাকে কনভিন্স করতে পেরছি নাকি সাইন্টিফিক কাউন্সিলের সেই মেম্বার মারা গেছে এটা অবশ্য জানা হবে না।

তবে এই ২% নিয়ে আমি যে খুশি বা সুখী সেটা বলতে পারব না। আমার কাছে এটা অনেক সময় পরীক্ষায় এ-প্লাসের মত মনে হয়। স্কুলের ছাত্ররা অনেকেই যেমন জানার চেয়ে মার্কের গুরুত্ব বেশি মনে করে, এখন অনেক বিজ্ঞানী বেশি বেশি পাবলিশ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এটা তাদের দোষ নয়। পরিস্থিতি বাধ্য করে তাদের পাবলিকেশন লিস্ট দীর্ঘ করতে। শুনেছি কোন কোন দেশে নাকি লোকজনকে বিচার করে তার ক্রেডিট কার্ডের স্বাস্থ্য দেখে। এখন বিজ্ঞানীদের মেধার বিচার করা হয় তারা কোন পত্রিকায় আর বছরে কতগুলো পেপার পাবলিশ করল, র‍্যাঙ্কিং-এ কত পারসেন্টের ব্যারিয়ার অতিক্রম করল, এসবের উপর। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর প্রফেসর হিগস এক ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন, “এখন যেভাবে বিজ্ঞানীদের মারকিং করা হয়, তাতে আমি যে এখনও চাকুরিচ্যুত হইনি সেটাই আশ্চর্যের বিষয়। আমি কালেভদ্রে পেপার পাবলিশ করি যা বর্তমান যুগে অচল। শুধু রিউমার ছিল যে আমি একসময় নোবেল প্রাইজ পেতে পারি, তাই কর্তৃপক্ষ সাহস করে আমাকে বরখাস্ত করেনি।” অনেক সময় মনে হয় এই রেটিং সিস্টেম এটা আসলে আমাদের পণ্য বানায়, আমাদের গায়ে এক ধরণের লেবেল এটে দেয় যা দেখিয়ে আমরা চাকুরির বাজারে নিজেদের বিক্রি করতে পারি।

তাহলে কি আমি রেটিং সিস্টেমের বিরুদ্ধে? ঠিক সেটা নয়। তবে এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। অনেক আগে একটা লেখা পড়েছিলাম, খুব সম্ভব ফ্রীম্যান ডাইসনের। সেখানে তিনি বলেছিলেন কেউ যদি বছরে ১০ -১২ (সংখ্যাটা অনেকটা এরকম) পেপার পাবলিশ করে করে তাকে নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। বিজ্ঞান মানেই সৃজনশীল কাজ। এটা শুধু করলেই হয় না, সেটা ধারণ করতে হয়। কিন্তু আজকাল এই রেটিং-এর ফলে চাকুরিদাতারা কোয়ালিটির থেকে কোয়ানটিটির দিকে দিকে নজর দেয় কারণ এর উপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রেটিং নির্ভর করে। ভাবখানা এই যেন কোয়ানটিটি কোয়ালিটি এনে দেবে। তাছাড়া এক সময় হাতে গোনা দুই একটা বাদ দিলে সব জার্নাল ছিল পাবলিকেশন চার্জ ফ্রি। কিউ-১, কিউ-২ ইত্যাদি ক্যাটাগরি না থাকায় এসব জার্নাল ছিল সম্মানিত। এখন চাকুরিদাতারা চায় ভাল ক্যাটাগরির জার্নাল পাবলিকেশন। ফলে এক ধরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এখন অনেক পাবলিকেশন হাউজ ফ্রি জার্নালের পাশাপাশি কমার্শিয়াল জার্নাল পাবলিশ করে। সেখানেও রিভিউ সিস্টেম। অনেক সময় ফ্রি জার্নালে পেপার পাঠালে তারা কৌশলে এসব কমার্শিয়াল জার্নালে পাঠাতে বলে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে সমস্ত বিষয়টি বানিজ্যিক রূপ নিচ্ছে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মত এখানেও তৈরি হচ্ছে সেলিব্রিটি। জার্নালগুলো পেপার পাবলিশ হবার পর লেখকদের উৎসাহিত করে ফেসবুক বা অন্যনায় সামাজিক মাধ্যমে সেটা জানাতে। অথচ সামাজিক মাধ্যমের বেশিরভাগ মানুষ গবেশনা থেকে অনেক দূরে। আচ্ছা, নিউটন, আইনস্টাইন, ফাইনম্যান, সত্যেন্দ্রনাথ বসু সহ হাজার হাজার বিজ্ঞানী যারা বিজ্ঞানকে আজকের এই শক্ত ভিতের উপর দাড় করিয়ে দিয়েছেন, তারা তো এসব রেটিং ছাড়াই দিব্যি কাজ করে গেছেন। বিগত সময়ে ইউরোপ আমেরিকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়েছে যার বেশিরভাগ আজ ব্যর্থ বলেই মনে হয়। আমাদের দেশে অনেক লেখক কবি আছেন যারা ধরেই নেন যদি বই মেলায় বই বের না করেন তাহলে জীবন বৃথা। কিন্তু সৃজনশীল কাজ তো অর্ডার দিয়ে হয় না, ভেতর থেকে আসতে হয়। তাই এই পারসেন্ট আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যায় সেটাই দেখার বিষয়।

বিঃদ্রঃ লেখাটি ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রগতির যাত্রীতে প্রকাশিত হয়েছে

বিজন ভাবনা (৬০): দুই পারসেন্ট   -বিজন সাহা https://share.google/seJ0Tq9ODs5vZ7BFQ

Comments

Popular posts from this blog

বিজন ভাবনা - (৫৫) চব্বিশের মীরজাফর

বিজন ভাবনা - (৪৭) যাত্রী একই তরণীর

বিজন ভাবনা - (২১) যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট